ভোলা
ভোলার ২০ লাখ মানুষের জন্য ২৫০ শয্যার হাসপাতাল, নেই আইসিইউ-ভেন্টিলেটর
ভোলার প্রায় ২০ লাখ মানুষের চিকিৎসার ভরসা ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল। অথচ গুরুতর রোগীদের জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনীয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও ভেন্টিলেটর সেবা সেখানে চালু হয়নি। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে হাসপাতালের একটি কক্ষে পড়ে আছে কোটি কোটি টাকা মূল্যের আইসিইউ সরঞ্জাম। ছয়টি আইসিইউ বেড ও তিনটি ভেন্টিলেটর থাকলেও সেগুলো কোনো দিন রোগীর সেবায় ব্যবহার করা যায়নি।
ফলে স্ট্রোক, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্টসহ গুরুতর অসুস্থ রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠাতে হচ্ছে বরিশাল কিংবা ঢাকায়। বিচ্ছিন্ন দ্বীপ জেলা হওয়ায় ভোলা থেকে অন্য জেলায় যেতে পাড়ি দিতে হয় নদীপথ। এতে জরুরি রোগীদের সময়মতো আইসিইউ সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পথেই কিংবা ভোলা ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও আইসিইউ চালুর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল না থাকায় আইসিইউ ইউনিট চালু করা যাচ্ছে না। জনবল চেয়ে একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো কোনো সমাধান হয়নি।
কোটি টাকার সরঞ্জাম পড়ে আছে পাঁচ বছরের বেশি
ভোলা ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে হাসপাতালটিতে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর মেশিনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়। এসব সরঞ্জামের মূল্য কয়েক কোটি টাকা। আইসিইউ ইউনিটে রয়েছে ছয়টি বেড ও তিনটি ভেন্টিলেটর মেশিন। এর সঙ্গে রয়েছে প্রয়োজনীয় অন্যান্য যন্ত্রাংশ। তবে সরঞ্জাম স্থাপনের পর থেকে এক দিনের জন্যও চালু হয়নি ইউনিটটি।
সরেজমিনে হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের সামনে গিয়ে দেখা যায়, কক্ষটি তালাবদ্ধ। ভেতরে সারি সারি করে রাখা হয়েছে আইসিইউ বেড ও ভেন্টিলেটর মেশিনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। ইউনিটের দায়িত্বে থাকা একজনের মাধ্যমে কক্ষটি খুলে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ হয়। সেখানে সরঞ্জামগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।
২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, ভোলা জেলার মোট জনসংখ্যা ১৯ লাখ ৩২ হাজার ৫১৮। পুরুষ ৪৮ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং নারী ৫০ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য জেলার প্রধান সরকারি হাসপাতালটিতে আইসিইউ সেবা চালু না থাকায় গুরুতর রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বাবাকে হারিয়ে আইসিইউ চালুর দাবিতে দাঁড়িয়েছেন ছেলে
হাসপাতালের সামনে প্ল্যাকার্ড হাতে আইসিইউ ও সিসিইউ চালুর দাবিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ভোলা পৌরসভার রিজার্ভ পুকুরপাড় এলাকার বাসিন্দা হাসনাইন আহমেদ নয়নকে। কয়েক দিন ধরে তিনি এভাবে হাসপাতালের সামনে অবস্থান করছেন।
নয়ন জানান, গত ২২ অক্টোবর রাতে তার বাবার হঠাৎ বুকে ব্যথা শুরু হয়। পরে তাকে ভোলা ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, তার বাবার জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ সেবা প্রয়োজন। এ জন্য তাকে বরিশাল কিংবা ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন তারা।
নয়ন বলেন, রাত প্রায় ১২টার দিকে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ভেদুরিয়া লঞ্চঘাটে যান তারা। সেখান থেকে একটি স্পিডবোট ভাড়া করে বরিশালে রওনা হন। রাত প্রায় ২টার দিকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান। সেখানে চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও মাস্ক আনতে বলেন। সেগুলো নিয়ে আসার পর তার বাবা মারা যান। সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে জানিয়েছেন, সময়মতো আইসিইউ সেবা দেওয়া সম্ভব হলে হয়তো তার বাবাকে বাঁচানো যেত।
বাবাকে হারানোর পর আইসিইউ চালুর দাবিতে অবস্থান নেওয়ার কারণ জানিয়ে নয়ন বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর আমি এতিম হয়েছি। আমাদের ভোলা ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ থাকার পরও পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে চালু হয়নি। যদি আইসিইউ চালু থাকত, তাহলে হয়তো আমার বাবা মারা যেতেন না। আমার মতো আর কোনো সন্তান যেন এভাবে বাবা হারা না হয়, সে জন্য প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছি। দ্রুত এই সেবা চালু করা হোক।
আইসিইউ না থাকায় বরিশাল যাওয়ার প্রস্তুতি
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বজনদের মধ্যেও আইসিইউ সেবা না থাকা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের একজন মো. ইলিয়াস। তার বাড়ি বোরহানউদ্দিন উপজেলার হাসাননগর ইউনিয়নে। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা শুরু হলে তার বাবাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ভোলা ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসেন। চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে ভর্তি করেন এবং ওষুধ দেন।
ইলিয়াস জানান, চিকিৎসকরা বলেছেন, ওষুধ ও স্যালাইন দেওয়ার পর রোগীর অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে। তবে পরিস্থিতির অবনতি হলে আইসিইউ সেবা লাগতে পারে। সে জন্য বরিশাল বা ঢাকায় নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে বলেছেন তারা। হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট থাকার কথা জানালে চিকিৎসকরা তাকে জানান, সেটি এখনো চালু হয়নি।
তিনি বলেন, টাকাপয়সা জোগাড় করে রাখছি। প্রয়োজনে বরিশাল নিয়ে যেতে হবে। এখানে আইসিইউ চালু থাকলে এত দুশ্চিন্তা করতে হতো না। বাবা পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত এই টেনশন থাকবে।
লালমোহন উপজেলার কালমা ইউনিয়নের ডাওরী বাজার এলাকার বাসিন্দা মো. মফিজুল ইসলামও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। স্ট্রোক করার পর তার বাবাকে ভোলা ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ওষুধ ও ইনজেকশন দিয়েছেন। তবে রোগীকে আইসিইউ সেবা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে জানিয়ে বরিশাল কিংবা ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
মফিজুল ইসলাম বলেন, আমরা এত টাকা নিয়ে আসিনি। এখন টাকা জোগাড় করছি, বরিশাল নিয়ে যাব। এখানে আইসিইউ সেবা থাকলে আমাদের মতো গরিব রোগীরাও কিছুটা ভালো সেবা পেতেন। এখন বাধ্য হয়ে বরিশাল যেতে হচ্ছে।
আরেক রোগীর স্বজন মিতু আক্তার ও সানজিদা ইসলাম জানান, তাদের বাবার স্ট্রোক হয়েছে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা দ্রুত আইসিইউতে ভর্তি করানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এ জন্য তাদের বরিশাল যেতে হচ্ছে। স্পিডবোট ভাড়া করে নদীপথে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
তাদের ভাষ্য, হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট থাকলেও চালু না থাকায় রোগীদের নিয়ে স্বজনদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম পড়ে থাকলেও সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
নদীপথ পেরিয়ে বরিশালে যেতে বাড়তি সময় ও খরচ
ভোলা একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ জেলা। এর চারপাশে মেঘনা, তেঁতুলিয়া নদী এবং এক পাশে বঙ্গোপসাগর। অন্য জেলার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকায় গুরুতর রোগীদের বরিশাল নিতে হলে নদীপথ পাড়ি দিতে হয়। বিশেষ করে রাত ১০টার পর রোগী নিয়ে যাতায়াতে ভোগান্তি আরও বাড়ে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
হাসপাতাল থেকে ভেদুরিয়া লঞ্চঘাটে অ্যাম্বুলেন্সে যেতে সময় লাগে প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট। এ জন্য ভাড়া দিতে হয় এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। ঘাট থেকে লঞ্চে বরিশাল যেতে সময় লাগে প্রায় সোয়া দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। তবে লঞ্চ চলাচল সাধারণত ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় একবার।
জরুরি প্রয়োজনে স্পিডবোট ভাড়া করে বরিশাল যেতে হয়। এতে সময় লাগে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট। তবে দিন কিংবা রাত—যখনই যেতে হোক, স্পিডবোট রিজার্ভ করতে হয়। এ জন্য খরচ পড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা।
ফেরিতে রোগী নিতে হলে ভোলা থেকে বরিশাল পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স রিজার্ভ করতে হয়। এতে খরচ পড়ে প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। হাসপাতাল থেকে ফেরিঘাটে যেতে অ্যাম্বুলেন্সে প্রায় ৩০ মিনিট লাগে। ফেরিতে ওঠার পর সেটি ছাড়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ফেরিতে ভোলা থেকে বরিশালের লাহারহাট পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। সেখান থেকে আবার অ্যাম্বুলেন্সে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে লাগে প্রায় এক ঘণ্টা।
স্থানীয় বাসিন্দা নাসরিন জাহান ও মো. রিফাত হোসেন জানান, ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে হাসপাতালে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া হলেও এখনো সেবা চালু হয়নি। এসব সরঞ্জাম তালাবদ্ধ কক্ষে পড়ে আছে। অথচ স্ট্রোক, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট, সড়ক দুর্ঘটনা ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত গুরুতর রোগীদের আইসিইউ সেবার জন্য বরিশাল কিংবা ঢাকায় পাঠাতে হয়। সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় পথে কিংবা হাসপাতালেই রোগীর মৃত্যু হচ্ছে।
তারা বলেন, ভোলা থেকে অন্য জেলায় সড়কপথে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাত ১০টার পর যাতায়াতের ভোগান্তিও বাড়ে। তাই জেলার মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত আইসিইউ চালুর দাবি জানান তারা।
জনবল সংকটে চালু হচ্ছে না আইসিইউ
আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সেবা চালু না হওয়ার বিষয়ে ভোলা ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তৈয়বুর রহমান জানান, ২০২১ সালের দিকে হাসপাতালটিতে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে। তবে আইসিইউ চালুর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, সিনিয়র স্টাফ নার্সসহ অন্যান্য জনবল দেওয়া হয়নি। এ কারণে পাঁচ বছরের বেশি সময় পার হলেও সেবাটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, জনবল চেয়ে আমরা বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আইসিইউ চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল দেওয়ার অনুরোধ করা হলেও এখনো কোনো ফল পাওয়া যায়নি। সেবাটি চালুর জন্য আমরা আবারও চেষ্টা করে যাচ্ছি।



