লিড
বরিশাল নগর উন্নয়নে ৭৩০ কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা
- ২৯ খাল পুনঃখনন ও ১০ পুকুর সংরক্ষন ও উন্নয়ন
- নির্মাণ হবে সেতু, সড়ক ও ড্রেন
- জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় উদ্যোগ
মির্জা রিমন ॥ বরিশাল নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসন, মৃতপ্রায় খালগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং পরিবেশ ও সৌন্দর্য উন্নয়নে ৭৩০ কোটি ৬৬ লাখ টাকার একটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পের আওতায় নগরীর ২৯টি খাল পুনঃখনন, ১০টি পুকুর সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, খালের দুই পাড় সংরক্ষণ, ড্রেন নির্মাণ, সেতু ও সড়ক উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ করা হবে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত চলতি অর্থবছরের ষষ্ঠ একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৩০ কোটি ৬৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নগরবাসীর আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বরিশাল নগরীর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে খালকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা সচল হওয়ার পাশাপাশি নগরীর পরিবেশ ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন ঘটবে।
প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য নগরীর ২৯টি খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা। এ জন্য খালের দুই পাড়ে প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল বা প্যালাসাইডিং ও সিট পাইলিং করা হবে। নির্মাণ করা হবে ফুটপাতসহ সিসি রাস্তা, হালকা যানবাহন চলাচলের উপযোগী সড়ক এবং খালসংলগ্ন আউটফল ড্রেন। পাশাপাশি ১০টি পুকুর সংরক্ষণ ও উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় বিভাজনে দেখা যায়, ৫৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার খালের পাড় সংরক্ষণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ৫৯ দশমিক ৭২ কিলোমিটার ফুটপাতসহ সিসি রাস্তা নির্মাণে ব্যয় হবে ২৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এ ছাড়া ২৯ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার হালকা যানবাহন চলাচলের রাস্তা প্রশস্তকরণে ৪৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা এবং ৪৭ হাজার ৫৮৯ মিটার খালসংলগ্ন আউটফল ড্রেন নির্মাণে ১৬৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।
যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে প্রকল্পের আওতায় ১৩টি আরসিসি সেতু নির্মাণে ৪৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এবং একটি পিসিসি সেতু নির্মাণে ১২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। নগরীর সৌন্দর্যবর্ধন ও নাগরিক সুবিধা বাড়াতে ১ হাজার ৫০টি বসার বেঞ্চ নির্মাণে ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, সমসংখ্যক স্ট্রিট লাইট স্থাপনে ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং ১ হাজার ৫০টি গার্ডেন লাইট স্থাপনে ১০ কোটি ১৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ১০টি পুকুর সংরক্ষণ ও উন্নয়নে ব্যয় হবে ৯৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
একসময় নদী ও খালের শহর হিসেবে পরিচিত ছিল বরিশাল। নগরীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা খালগুলো ছিল পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম। এসব খাল দিয়ে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন যোগাযোগও চলত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো খাল হারিয়েছে অস্তিত্বও। নগরীর ২৪টি খালের মধ্যে বর্তমানে জেল খাল, সাগরদী, লাকুটিয়া, টিয়াখালী, মোহাম্মদপুর, আমানতগঞ্জ, জাগুয়া ও হরিনাফুলিয়া খালের আংশিক অস্তিত্ব রয়েছে। সেগুলোর অবস্থাও নাজুক। দখল ও দূষণে অধিকাংশ খাল মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। কোথাও খালের জায়গা সংকুচিত হয়েছে, কোথাও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে নগরীর নিচু এলাকাগুলোতে হাঁটুপানি জমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে পানি ঢুকে পড়ে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক ও আবাসিক এলাকায় ব্যাহত হয় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। নগরবাসীর অভিযোগ, খাল দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ায় প্রতিবছর জলাবদ্ধতার ভোগান্তি বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে খাল পুনরুদ্ধার ও স্থায়ী পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁরা। এদিকে, নগরীর খাল পুনরুদ্ধারে প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ব্যয় নিয়ে আগেও অগ্রগতি হয়েছিল।
প্রথম পর্যায়ে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৭০১ কোটি ৫৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ সরকারি অনুদান এবং ২০ শতাংশ সরকারি ঋণের মাধ্যমে অর্থায়নের বিষয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতি পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্প প্রস্তাবনা সংশোধন করে ব্যয় বাড়িয়ে ৭৩০ কোটি ৬৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
প্রকল্পটি অনুমোদনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, সাবেক সংসদ সদস্য এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন। এক বিবৃতিতে তিনি বরিশালবাসীর পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, নগরীর বিভিন্ন খালের পাড় সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও পুনঃখননের এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসন, আধুনিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং খালগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। পাশাপাশি নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন বাড়বে।
তিনি আরো বলেন, প্রকল্পের আওতায় ১০টি খালের সৌন্দর্যবর্ধন এবং ২০টি খাল খননের উদ্যোগ বরিশালের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি বরিশালকে পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বরিশালবাসীর জীবনমান উন্নয়ন ও নগরীর নান্দনিক সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সরকারের এ উদ্যোগ সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করে প্রকল্পটি অনুমোদন করায় প্রধানমন্ত্রীকে পুনরায় ধন্যবাদ জানান তিনি।



