বরিশাল
এবার শায়েস্তাবাদ ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যান ফরহাদের বিরুদ্ধে ১৩ অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল সদর উপজেলার ৪নং শায়েস্তাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সামছুল কবির ফরহাদ ওরফে ফরহাদ মেম্বারের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে অনাস্থা প্রস্তাব দিয়েছেন পরিষদের নির্বাচিত ৯ জন সদস্য।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বরিশাল জেলা প্রশাসক ও বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর লিখিতভাবে এ অনাস্থা প্রস্তাব ও অভিযোগ দাখিল করেন তারা। অভিযোগকারী ইউপি সদস্যরা হলেন—১নং ওয়ার্ডের সদস্য মোঃ কবির হোসেন, ২নং ওয়ার্ডের মোঃ সবুজ খান, ৪নং ওয়ার্ডের মোঃ রিয়াজ উদ্দিন খান, ৫নং ওয়ার্ডের আল আমিন (ফায়জুল মৃধা), ৬নং ওয়ার্ডের জসিম খান, ৭নং ওয়ার্ডের সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ১, ২ ও ৩নং সংরক্ষিত নারী সদস্য মোসাঃ লাবনী, ৪, ৫ ও ৯নং সংরক্ষিত নারী সদস্য মোসাঃ কাজল বেগম এবং ৫, ৭ ও ৮নং সংরক্ষিত নারী সদস্য মোসাঃ সান্তা ইসলাম। লিখিত অভিযোগে সদস্যরা দাবি করেন, পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনায় প্যানেল চেয়ারম্যান দায়িত্বশীল আচরণ করছেন না এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়ম করছেন।
পরিষদের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় না রেখে স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। পাশাপাশি পরিষদের সিদ্ধান্ত ও বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা পরিষদের স্বার্থের পরিপন্থী বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে হোল্ডিং নম্বর প্লেট বিতরণ ও অর্থ আদায়ের বিষয়টি। সদস্যদের দাবি, সাবেক চেয়ারম্যান আরিফুজ্জামান মুন্নার দায়িত্বকালীন সময়ে ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডের ঘরে ঘরে হোল্ডিং নম্বর প্লেট স্থাপন করা হয়েছিল। বর্তমানে সেই নম্বর প্লেটগুলো বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও পরিষদের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা ও পরিষদের সিদ্ধান্ত ছাড়াই পুনরায় হোল্ডিং নম্বর প্লেট বিতরণ করা হচ্ছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিটি নম্বর প্লেটের জন্য ২০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। ইউনিয়নে আনুমানিক ৭ হাজার নম্বর প্লেটের হিসাবে প্রায় ১৪ লাখ টাকা আদায়ের বিষয়টি উল্লেখ করে সদস্যরা বলেন, প্রতিটি ঘরে আগে থেকেই হোল্ডিং নম্বর প্লেট থাকার পরও নতুন প্লেটের জন্য অর্থ আদায় করায় সাধারণ জনগণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ক্ষোভও সৃষ্টি হচ্ছে বলে দাবি তাদের। আদায়কৃত অর্থ ইউনিয়ন পরিষদের হিসাবভুক্ত হয়েছে কি না, পরিষদের তহবিলে যথাযথভাবে জমা হয়েছে কি না এবং এ কার্যক্রমের আইনগত ও প্রশাসনিক অনুমোদন রয়েছে কি না—তা তদন্ত, যাচাই ও হিসাব-নিরীক্ষার মাধ্যমে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী সদস্যরা। এছাড়া ভূমিকর থেকে আসা ১ শতাংশের টাকা গোপনে আত্মসাতের অভিযোগও আনা হয়েছে প্যানেল চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। পরিষদের সভা ও রেজুলেশনে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বাস্তবে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে ভিন্নভাবে কাজ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন সদস্যরা। অভিযোগে আরও বলা হয়, ইউনিয়ন পরিষদের আয়-ব্যয়ের হিসাব সদস্যদের না দিয়ে একক সিদ্ধান্তে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ইউনিয়ন পরিষদ সংস্কারের নামে ১ শতাংশের বরাদ্দ থেকে ৯ লাখ টাকা গ্রহণ করা হলেও অদ্যাবধি কোনো কাজ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তারা। ফলে ওই অর্থ কোথায় ও কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সদস্যরা।একই অর্থবছরে শিক্ষা উপকরণ বিতরণের নামে ১ শতাংশ বরাদ্দ থেকে ৮ লাখ টাকা গ্রহণ করা হলেও অদ্যাবধি ওই অর্থের বিপরীতে ঘোষিত শিক্ষা উপকরণ বিতরণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। পরিষদের সভায় এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্যানেল চেয়ারম্যান বিষয়টি এড়িয়ে যান বলে দাবি সদস্যদের। এসব অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়েছে কি না, তা তদন্ত ও হিসাব-নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
শায়েস্তাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন দুটি খেয়াঘাট ইজারা দিয়ে তার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে। পাশাপাশি গত দুই বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদের আয় থেকে নির্বাচিত সদস্যদের কোনো ধরনের সম্মানী দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী সদস্যরা আরও দাবি করেন, ইউনিয়ন পরিষদে ১ শতাংশ বরাদ্দ আসার পর ওই অর্থকে ‘মাননীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহোদয়ের বিশেষ বরাদ্দ’ হিসেবে উল্লেখ করে অর্থ গ্রহণ বা ব্যয় করার অভিযোগ রয়েছে। এ অর্থের প্রকৃত বরাদ্দের উৎস, অনুমোদন এবং ব্যয়ের হিসাব যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তারা। এদিকে পরিষদের সদস্যদের অবগত না করে শায়েস্তাবাদ বাজার উন্নয়নের কাজ করানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন সদস্যরা। ওই কাজের অর্থ কোন বরাদ্দ থেকে নেওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত পরিষদের সদস্যদের জানানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। লিখিত অভিযোগে এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই, হিসাব-নিরীক্ষা এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ৯ ইউপি সদস্য। একই সঙ্গে পরিষদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে জবাবদিহিতা ও সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বরিশাল
সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোছাঃ ফরিদা সুলতানা বলেন, প্যানেল চেয়ারম্যান মোঃ শামছুল কবিরের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরে আইসিটি অফিসারকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি প্রতিবেদন জমা দেয়ার পরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বরিশাল জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ মামুন খন্দকার বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত সাপেক্ষে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।



