বরিশাল
তদন্তে বেরিয়ে এলো আসল রহস্য
মামলার নাটক সাজিয়ে শেষ রক্ষা পেলো না তিন শিক্ষক
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বরিশালে সরকারি স্কুল শিক্ষকদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তিন শিক্ষক বদলি ঠেকাতে স্বেচ্ছায় মামলা সাজিয়েও শেষ রক্ষা পাননি। নানা বিতর্ক, অনুসন্ধান ও প্রশাসনিক তদন্তের পর বরিশাল জিলা স্কুল ও রুপাতলী সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তিন বিতর্কিত শিক্ষক অবশেষে বদলিকৃত নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট দুই স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা। তবে এত কিছুর পরও ওই তিন শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, বদলি ঠেকাতে সরকারি নিয়মকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার এই ঘটনায় শুধু তিন শিক্ষকই নন, তাঁদের সহযোগিতায় সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং পুলিশের একজন কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। এ নিয়ে দৈনিক দেশ জনপদ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসনের একাধিক সংস্থা তদন্তে নামে। তদন্তে উঠে আসে, এই অনিয়ম ও অপকর্মে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার এসআই পার্থ সারতীর পাশাপাশি বরিশাল জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম ও রুপাতলী সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মারজিয়া আকতারের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সূত্র মতে, গত ১ ডিসেম্বর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত রেখে পেশাগত মর্যাদা ও বেতন-ভাতাসহ চার দফা দাবিতে বরিশালে শিক্ষকরা আন্দোলনে নামেন। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন বরিশাল জিলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক মুহাম্মদ শাহাদাত হুসাইন এবং রুপাতলী সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. এ রাজ্জাক ও মো. আক্তারুজ্জামান। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ ও নির্দেশনার পর আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়। আন্দোলন প্রত্যাহারের মাত্র নয় দিনের মাথায় গত ১০ ডিসেম্বর শিক্ষা প্রশাসন ওই তিন শিক্ষককে যথাক্রমে হাতিয়া, ভোলা ও কাউখালি উপজেলায় বদলির আদেশ দেয়। একই প্রজ্ঞাপনে ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে বিমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশও দেওয়া হয়। বদলির আদেশ কার্যকর হওয়ার আগেই গত ১৩ ডিসেম্বর তিন শিক্ষক কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি নন-এফআইআর মামলায় নিজেদের স্বেচ্ছায় আসামি করেন বলে অভিযোগ ওঠে। মামলাটি রুজু হয় ৪৯৮/২৫ নম্বরে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বিধিতে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা চলমান থাকলে বদলি স্থগিত রাখার সুযোগকে সামনে রেখেই পরিকল্পিতভাবে এই আইনি কৌশল নেওয়া হয়। মামলার নথি অনুযায়ী, ১৩ ডিসেম্বর নগরীর বিবির পুকুর পাড় এলাকায় ভীতিমূলক ডাক-চিৎকার করে জনশান্তি বিঘ্নের অভিযোগে তাঁদের ১০৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়। পরদিন ১৪ ডিসেম্বর ৮১ ধারার নন-এফআইআর মামলায় আদালতে পাঠানো হলে তাঁরা জামিন লাভ করেন। তবে মামলার বিবরণ ও বাস্তব ঘটনার মধ্যে একাধিক অসঙ্গতি উঠে আসে। অভিযোগ রয়েছে, ওই রাতে তিন শিক্ষকের কাউকেই থানায় আটক রাখা হয়নি। তাঁরা সরাসরি পরদিন আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেন। অথচ মামলায় ‘সন্দেহমূলক গ্রেফতার’ এর উল্লেখ থাকায় মামলার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এছাড়া সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঘটনার সময় টাউন হল এলাকা, কোতোয়ালি মডেল থানা কিংবা আদালত চত্বরে ওই তিন শিক্ষকের উপস্থিতির কোনো দৃশ্য পাওয়া যায়নি। ফলে প্রশ্ন দেখা দেয় গ্রেফতার দেখানো রাতে তাঁরা আসলে কোথায় ছিলেন? অভিযুক্ত এসআই পার্থ সারতী ওই তিন শিক্ষককে নন-প্রসিকিউশনে দিয়ে আদালতে পাঠান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বড় একটি ঘটনা বরিশালের মিডিয়া অঙ্গনের বাইরে থেকে যায়। অনুসন্ধানকারীদের মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কৌশলে সম্পন্ন করা হয়েছিল।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার শফিকুল ইসলাম তদন্তের নির্দেশ দেন এবং একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। তদন্তে এসআই পার্থ সারতীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সব বিতর্ক ও তদন্তের পর শেষ পর্যন্ত ওই তিন শিক্ষক বদলিকৃত নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করলেও সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকরা এই পুরো ঘটনায় কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেননি। বরং অভিযোগ উঠেছে, বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তিন শিক্ষকের এই মামলাকেন্দ্রিক কৌশল এখন সামাজিক ও পেশাগত নৈতিকতার আলোচনায় তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।



