ঝালকাঠি
মাদ্রাসায় নিয়োগ: বিএনপি নেতার টাকা গুনে নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, অপসারণ চান দলীয় নেতারা
ঝালকাঠীর নলছিটি ইউনিয়নের রানাপাশ হোসাইনিয়া হামিদিয়া দাখিল মাদ্রাসার সভাপতি এবং জেলা বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক মো. নাসির আহম্মেদ তালুকদারের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
গতকাল রোববার কথিত ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়। স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরাই ওই দিন মাদ্রাসায় গিয়ে সুপারকে এই নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত এবং সভাপতির অপসারণ দাবি করেছেন।
এদিকে আজ সোমবার নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্যর ঘটনা তদন্তের আবেদন করেছেন ২ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন বলে দাবি করা চাকরিপ্রার্থী মো. কাওছার-সহ বেশ কয়েকজন।
অভিযোগ উঠেছে, মাদ্রাসায় অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পেতে মো. কাওছার নামে এক ব্যক্তি মাদ্রাসার সভাপতি নাসির আহম্মেদ তালুকদারকে গত ১ জুলাই তাঁর বাসায় গিয়ে ২ লাখ টাকা দেন। ওই টাকা গুনে দেন মাদ্রাসার দপ্তরি মো. ইব্রাহিম। সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে, মাদ্রাসার দপ্তরি মো. ইব্রাহিম টাকা গুনে নাসির তালুকদারকে দিচ্ছেন। এ সময় নাসির অফিস সহায়ক পদপ্রার্থী কাওছারকে বলেন, ‘দায়িত্ব সব আমার। মোর বাসায় বইয়া খাতায় লেইখা চইলা যাবা।’ তিনি জানতে চান, ‘টাহা দিবি না আইজ?’
এ সময় চাকরি প্রার্থী কাওছার বলেন, ‘এই কিন্তু দুই লাখ টাকা দেওয়া হইছে মামা। বিলটা কিন্তু কইরা দিতে হবে মামা।’ জবাবে সভাপতি নাসির বলেন, ‘সামনের মাসের মধ্যে অল কমপ্লিট বেতনাদির। আমি এ জন্যই বিজ্ঞপ্তি বাহিরে ছাড়িনি। কারণ আমারে ঘরের শত্রু বিভীষণ। শত্রু হইয়া কিছু করার নাই।’ এ সময় কাওছার দপ্তরিকে বলেন, ‘দেন আপনার হাত দিয়েই দেন।’ সভাপতি বলেন, ‘এই টাহা এহানেই পইড়া থাকবে। কোনোহানের টাহা কোনোহানে লাগাই না।’
জানতে চাইলে চাকরিপ্রার্থী কাওছার আজকের পত্রিকাকে বলেন, তিনি চাকরির জন্য মাদ্রাসা সভাপতিকে কয়েক ধাপে ৬ লাখ টাকা দিয়েছেন। ভিডিওর সময় ২ লাখ দিয়েছেন। কিন্তু সভাপতি এখন ফোন ধরেন না। একই সঙ্গে ল্যাব সহকারী এবং নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের জন্য একটি অখ্যাত পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কয়েকজনের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন।
কাওছার স্বীকার করেন, নিজেই ওই ভিডিও ধারণ করেছিলেন। এর বিচার চেয়ে আজ ইউএনওর কাছে তিনিসহ ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানান কাওছার।
টাকা নেওয়ার বিষয়ে মাদ্রাসার দপ্তরি মো. ইব্রাহিম বলেন, লেনদেনের সময় তিনি ছিলেন। টাকা নেওয়া হয়েছিল চাকরি দেওয়ার জন্য। ১ লাখ টাকা তিনি গুনে দিয়েছেন। পরে শুনেছেন আরও ১ লাখ টাকা দিয়েছেন কাওছার।
তবে মাদ্রাসার সভাপতি ও ঝালকাঠী জেলা বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক মো. নাসির আহম্মেদ তালুকদার বলেন, ‘ভিডিওর বিষয়টি ষড়যন্ত্র। ভিডিওতে যে টাকা গোনার চিত্র দেখা গেছে তা জমি বিক্রির। এখন একটা চক্র আমার মাদ্রাসায় গিয়ে আমাকে পদত্যাগ করার কথা বলে এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘ইউএনও এর কাছে অভিযোগ দিয়ে থাকলে তা তদন্ত করে দেখা হোক।’
এ বিষয়ে রানাপাশা ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেহেদী খান বলেন, মাদ্রাসায় নিয়োগে প্রকাশ্যে ঘুষ বাণিজ্য চলেছে। এটা ফাঁস হওয়ায় তাঁরা গতকাল রোববার মাদ্রাসা সুপারের সঙ্গে দেখা করে নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ রাখা ও সভাপতির অপসারণ দাবি করেছেন। সুপার বলছেন, এটা সম্পূর্ণ সভাপতি করেছেন। এই নিয়োগ স্থগিত রাখা হবে।
মাদ্রাসার সুপার মাওলানা মো. আবুল বাসার বলেন, ‘আমার সভাপতি নাসিরের নামে নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। ভিডিওতে দেখেছেন তাঁর মাদ্রাসার দপ্তরি ইব্রাহিম সভাপতিকে গুনে টাকা দিচ্ছে। সভাপতি ঘুষ নিয়েছে এমন অভিযোগে স্থানীয় বিএনপি নেতারা রোববার মাদ্রাসায় এসেছিলেন। তাঁরা বলেছেন, সভাপতিকে অব্যাহতি দেবে, না হয় ওনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেবেন তাঁরা।’ সুপার স্বীকার করেন, তিনটি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিলেন। কিন্তু কার্যক্রম বর্তমানে স্থগিত আছে।
মাদ্রাসা কমিটির বিদ্যোৎসাহী মো. ফয়সাল খান বলেন, জনবল নিতে হলে ম্যানেজিং কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হতে হয়। কিন্তু এ ধরনের কোনো সভা হয়নি। তিনি বলেন, ভিডিওতে প্রমাণ হয়ে গেছে যে সভাপতি টাকা নিয়েছেন। ২ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আমাদের অগোচরে কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি না তা পরবর্তী সভায় জানতে চাওয়া হবে।
ফয়সাল বলেন, ‘সভাপতিকে এ ধরনের অপকর্মের বুদ্ধিদাতা মাদ্রাসার সুপার।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রিজভী আহমেদ সবুজ বলেন, তিনি জেলায় জরুরি সভায় আছেন। যে কারণে অভিযোগটি খতিয়ে দেখতে পারেননি। তিনি গিয়ে ব্যবস্থা নেবেন।



