বরিশাল
বরিশালে আনসার বাহিনীর গাড়ির ধাক্কায় শিশুর মৃত্যু, মামলা করে বিপাকে সন্তানহারা মা
নিজস্ব প্রতিবেদক : দেখতে দেখতে কেটে গেল দীর্ঘ চার চারটে মাস, কিন্তু সন্তান হারানোর বিচার পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো বুকভরা আতঙ্ক আর ভয়ে দিন কাটছে এক অসহায় মায়ের। বরিশাল নগরীর রূপাতলীতে আনসার বাহিনীর গাড়ির ধাক্কায় ১১ বছরের মেধাবী শিশু জুবায়েরের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় এবার সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অভিযুক্ত চালক সিরাজুল ইসলাম এখনো বহাল রয়েছেন চাকরিতে। অন্যদিকে মামলা তুলে নিতে আনসার বাহিনীর পক্ষ থেকে ভুক্তভোগী পরিবারকে অনবরত ভয়ভীতি দেখানো ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি গত ১৬ ফেব্রুয়ারির। ঝালকাঠি-বরিশাল মহাসড়কের রূপাতলী এলাকার বাংলাদেশ বেতার অফিসের সামনে বরিশাল আনসার ব্যাটালিয়নের একটি বেপরোয়া গতির ট্রাক পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেয় একটি মোটরসাইকেলকে। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় শিশু জুবায়ের। এ সময় হাত ভেঙে গুরুতর আহত হন তার মা জেসমিন আক্তার, যা তাকে ঠেলে দিয়েছে পঙ্গুত্বের দিকে। ঘাতক গাড়িটি চালাচ্ছিলেন বরিশাল আনসার ব্যাটালিয়নের হেড অফিসে কর্মরত চালক সিরাজুল ইসলাম।
এদিকে কোন উপায় না পেয়ে ভুক্তভোগী জেসমিন আক্তার ১৭ ফেব্রুয়ারি আদালতের শরণাপন্ন হন। অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের বিচারক এস এম শরীয়তুল্লাহ বিষয়টি আমলে নিয়ে কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশকে এজাহার গ্রহণের নির্দেশ দেন। সেই মামলায় পুলিশ চালক সিরাজুল ইসলামকে আটক করে আদালতে সোপর্দ করলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহারের খেলা শুরু হয় এরপরই।
অভিযোগ রয়েছে, দুর্ঘটনার পরপরই ১৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল রেঞ্জ ও পটুয়াখালী আনসার ব্যাটালিয়নের তৎকালীন সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ফরিদসহ কয়েকজন সদস্য চিকিৎসাধীন ও শোকাহত ওই নারীকে চাকরি এবং আর্থিক সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে মামলা তুলে নিতে বলেন। এই শর্তে তিনি রাজি না হলে জোরপূর্বক কয়েকটি ফাঁকা স্ট্যাম্পে তার টিপসই নিয়ে চালক সিরাজুল ইসলামের জামিনের ব্যবস্থা করা হয়।
গত ১১ মার্চ সিরাজুল জামিনে বের হওয়ার পর খোলস পাল্টে ফেলে আনসার বাহিনী। মামলা তুলে নিতে সন্তানহারা এই নারীকে দফায় দফায় আনসার অফিসে ডেকে নিয়ে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি আদালত থেকে ওই নারীর উন্নত চিকিৎসার নির্দেশ দিলে তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে গিয়েও অভিযুক্ত সিরাজুল ওই নারীকে মামলা তুলে নিতে প্রাণনাশের হুমকি দেন। চরম নিরাপত্তাহীনতায় গত ১২ মে কোতয়ালী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ভুক্তভোগী নারী। পরবর্তীতে বিষয়টি আদালতকে জানানো হলে বিচারক এস এম শরীয়তুল্লাহ অভিযুক্ত সিরাজুলের জামিন বাতিল করে পুনরায় তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ঘটনার চার মাস পেরিয়ে গেলেও সন্তানহারা মায়ের ক্ষোভ আর আর্তনাদ থামেনি। সাংবাদিকদের কাছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি অভিযোগ করেন, এত বড় অপরাধ করার পরও চালক সিরাজুল ইসলামকে এখনো আনসার বাহিনী থেকে বরখাস্ত বা অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। উল্টো পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বরিশাল আনসার বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা।
একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চালক কীভাবে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এখনো চাকরিতে বহাল থাকে, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী নারী। তার স্পষ্ট দাবি—অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এই অপরাধী চালককে স্থায়ীভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে এবং তাদের পরিবারকে শতভাগ আইনী সুরক্ষা দিতে হবে।
এ বিষয়ে বরিশাল রেঞ্জ ও পটুয়াখালী আনসার ব্যাটালিয়নের তৎকালীন সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ফরিদ রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। মুঠোফোনে তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না। ওখানের কর্মকর্তারা আছেন, তাদের সাথে কথা বলেন। আমি বদলি হয়ে পঞ্চগড়ে চলে এসেছি।
ঘটনার চার মাস পর এই অসহায় মায়ের আর্তনাদ কি পৌঁছাবে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের কান পর্যন্ত নাকি ক্ষমতার দাপট আর আইনী মারপ্যাঁচে চিরতরে চাপা পড়ে থাকবে শিশু জুবায়ের হত্যার বিচার। এমনটাই সচেতন মহলের প্রশ্ন।



