বরিশাল
বছরে বাস্তুহারা লক্ষাধিক মানুষ
নদীভাঙনে ছোট হয়ে আসছে বরিশাল
নদীবেষ্টিত অঞ্চল বরিশাল। কীর্তনখোলা, পদ্মা, মেঘনা, কালাবদর, আড়িয়াল খাঁ, তেঁতুলিয়া, সন্ধ্যা, কারখানাসহ অসংখ্য নদী বয়ে চলেছে বরিশালের চারদিক থেকে। ফলে বছরজুড়েই নদীভাঙনে পাল্টে যাচ্ছে বরিশালের মানচিত্র। নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে মাইলের পর মাইল ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
স্যাটেলাইট চিত্র বলছে, নদীভাঙনের কারণে বরিশালের ভৌগোলিক মানচিত্র ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। বর্তমানে বরিশাল বিভাগের প্রায় ১০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ মারাত্মকভাবে ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে।
অন্যদিকে, পরিবেশবিদ ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, শুধু গত পাঁচ বছরেই বরিশালের মানচিত্র থেকে নদীতে বিলীন হয়েছে অন্তত ১২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা।
মূলত অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, ইটভাটার জন্য নদীর তীর কেটে নেওয়া এবং যথাযথভাবে নদীশাসনের অভাবেই প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুহারা হচ্ছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীসহ সচেতন মহলের।
জানা গেছে, বরিশাল জেলার মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুই উপজেলা মেহেন্দীগঞ্জ এবং হিজলা। এ দুটি উপজেলার বুক চিড়ে বয়ে গেছে পদ্মা, মেঘনা, কালাবদর, তেঁতুলিয়াসহ বেশ কিছু শাখা নদী। ফলে বছরজুড়েই দুটি উপজেলার একের পর এক গ্রাম নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি- গত ৩০ বছর ধরে মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে হিজলা উপজেলার গৌরবদী ইউনিয়ন। উপজেলার সত্তরোর্ধ্ব বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ মোল্লা জানালেন, মেঘনার বিশাল জলরাশির দিকে তাকিয়ে তিনি স্মৃতিচারণ করেন হারিয়ে যাওয়া বসতভিটার।
অশ্রুসজল চোখে নুর মোহাম্মদ মোল্লা বলেন, ‘যে মাটিতে আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে, আজ তার পুরোটাই মেঘনা নদীর গর্ভে। পাকা ঘরবাড়ি, ধানি জমি, বাপ-দাদার ভিটে সবকিছুই চোখের সামনে তলিয়ে গেছে।’
একই এলাকার বাসিন্দা রাবেয়া বেগমের আশঙ্কা, নদী যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে দ্রুত বাঁধ না দিলে পুরো ইউনিয়নই একদিন মানচিত্র থেকে মুছে যাবে। তারা ত্রাণ কিংবা আর্থিক সহায়তা নয়, শেষ সম্বল রক্ষায় মেঘনায় টেকসই বাঁধ চান।
অন্যদিকে হিজলা এবং মেহেন্দিগঞ্জের মতোই সন্ধ্যা ও আড়িয়াল খাঁর ভাঙনে দিশেহারা পার্শ্ববর্তী মুলাদী এবং বাবুগঞ্জ উপজেলাবাসী। বিশেষ করে যুগ যুগ ধরে সন্ধ্যা ও আড়িয়াল খাঁর তীব্র ভাঙনে বাবুগঞ্জের মানচিত্র থেকে হারাতে বসেছে একের পর এক গ্রাম। স্থানীয়দের দাবি—নদীবেষ্টিত এই উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে মাধবপাশা ছাড়া বাকি সব কটি ‘কেদারপুর, চাঁদপাশা, দেহেরগতি, রহমতপুর ও জাহাঙ্গীরনগর’ ইউনিয়নে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
এ ছাড়া কীর্তনখোলা নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বরিশাল সদর উপজেলার একের পর এক গ্রাম। বিশেষ করে চরবাড়িয়া, শায়েস্তাবাদ ইউনিয়ন। এর মধ্যে কীর্তনখোলা নদীর ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চরবাড়িয়া ইউনিয়ন। সেখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরও গত বর্ষা মৌসুমে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
চরবাড়িয়ার বাসিন্দা আবদুল ছালাম গাজী বলেন, নদী আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে। তিনবার বাড়ি হারিয়ে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এখন এই জায়গাটাও ভাঙনের মুখে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমাদের নদীতে ডুবে মরা ছাড়া উপায় থাকবে না।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৮৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বছরের পর বছর নদীভাঙনের কারণে সংকুচিত হচ্ছে বরিশালের মানচিত্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তলদেশ থেকে অবাধে বালু উত্তোলন এই ঝুঁকিকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরও অনেক এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর বরিশাল বিভাগীয় আহ্বায়ক রফিকুল আলম বলেন, অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং নদী থেকে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণেই প্রতি বছর বরিশালে লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুহারা হচ্ছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের ১০২ কিলোমিটার বাঁধ বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বিগত ৫-৮ বছরে নদীভাঙন রোধে অন্তত ১০টির মতো প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। যার অধিকাংশই পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আটকে গেছে। যে কারণে নদীভাঙনের কবল থেকে বরিশাল রক্ষা শুধু প্রতিশ্রুতিতেই আটকে আছে।
এ প্রসঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধের পাশাপাশি স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য কয়েকটি বড় প্রকল্প তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।



