পিরোজপুর
পিরোজপুরের জেলে পল্লীতে নেই ঈদের আমেজ, নিষেধাজ্ঞায় মেলেনি বরাদ্দের চাল
দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। তবে উৎসবের সেই আমেজ নেই পিরোজপুরের জেলে পল্লীগুলোতে। সামুদ্রিক মৎস্য সংরক্ষণ ও টেকসই আহরণ নিশ্চিত করতে সাগরে মাছ ধরায় ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন জেলার প্রায় সাড়ে ৫ হাজার নিবন্ধিত সমুদ্রগামী জেলে। নিষেধাজ্ঞার পাঁচ সপ্তাহ পার হলেও অধিকাংশ জেলে এখনো সরকারি বরাদ্দের চাল না পাওয়ায় পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সরেজমিনে পিরোজপুরের পাড়েরহাট জেলে পল্লী ও মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটে সারি সারি নোঙর করে রাখা হয়েছে মাছ ধরার ট্রলার। সাগরে যেতে না পারায় অধিকাংশ ট্রলারে চলছে মেরামতের কাজ। যে মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে প্রতিদিন ভোর থেকে চলত লাখ লাখ টাকার মাছ বেচাকেনা, সেখানে এখন বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা। নেই আগের সেই কোলাহল, কিংবা ব্যস্ততা।
কেউ জাল বুনছেন, কেউ ট্রলার মেরামতে ব্যস্ত। আবার অনেকে কাজের অভাবে বাড়ি ফিরে গেছেন। কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে অন্যের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করছেন।
একই চিত্র জেলার জিয়ানগর উপজেলার সাঈদখালী চর এবং মঠবাড়িয়া উপজেলার মঝেরচরসহ বিভিন্ন ছোটো-বড়ো জেলে পল্লীতে দেখা যায়।
এসব জেলেরা জানান, একদিকে আয় বন্ধ, অন্যদিকে এনজিও ও মহাজনের ঋণের চাপ—সব মিলিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে তাদের। অনেকের অভিযোগ, জেলে কার্ড না থাকায় সরকারি সহায়তার আওতায়ও আসতে পারছেন না তারা।
জেলে রিয়াজ হাওলাদার বলেন, ‘মোগো দিন খুব খারাপ যায়। বর্তমানে কোনো আয় নাই। সরকার যদি কোনো সহযোগিতা বা কাজের ব্যবস্থা করতো, তাইলে নাতি-পুতি নিয়া একটু ভালো থাহা যাইতো।’
আরেক জেলে জাকির শেখ বলেন, ‘এই অবরোধের ভিতরে আমরা জাল হারতেছি। কোনো ঈদ নাই আমাগো। সপ্তাহে এক-দুই দিন কাজ হয়। এতদিন অবরোধ গেল, এহনো চাল পাই নাই। কিস্তির জন্য লোক আইয়া বইয়া থাহে। মাইয়া-পোলারে পড়াইতেও পারি না।’
হামিদা নামে এক জেলের স্ত্রী বলেন, ‘আমার স্বামীর কোনো ইনকাম নাই। এক কেজি চাল আনলে দুই দিন খাই। নিজে না খাইয়া থাকি, নাতিগো খাবার দিতে হয়। না থাকলে পামু কোতায়?’
ট্রলার শ্রমিক আলী হোসেন বলেন, ‘এই অবরোধের মধ্যে ট্রলার মালিকরা ট্রলারগুলো ডকে এনে মেরামত করতেছে। এজন্য কিছুদিন কাজ পাইতেছি। এরপর আর কোনো কাজ থাকব না। মাঝে মধ্যে অন্যের বাড়িতে বদলা দিয়া চলতে হয়।’
জেলেদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে তারা পরিবার নিয়ে এতটা সংকটে পড়তেন না। একইসঙ্গে ভারতের সঙ্গে সময় মিলিয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় ভবিষ্যতে সাগরে মাছের উৎপাদন বাড়বে বলেও আশা করছেন তারা।
এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জীব সন্নামত বলেন, জেলেদের ৫৮ দিনের সমুদ্রে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে জেলায় ৫ হাজার ৩৯৩ জন জেলের মাঝে পরিবারপ্রতি ৭৭ দশমিক ৩৩ কেজি হারে মোট ৪১৭ দশমিক ৪১ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কেউ বাদ পড়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়ে পরবর্তীতে সহায়তা পাবে। এ ছাড়া, চাল বিতরণে কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে ইউএনও ও মৎস্য কর্মকর্তার কাছে আবেদন করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ‘
তিনি আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে এবার জেলেরা পর্যাপ্ত মাছ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘমেয়াদি এই নিষেধাজ্ঞা কার্যক্রম আগামী ১১ জুন পর্যন্ত চলমান থাকবে। এ সময়ে জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা নিশ্চিত না করা গেলে উপকূলীয় অঞ্চলে মানবিক সংকট আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



