বরিশাল
বরিশালে পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার চাপে দিশেহারা নারী কর্মী!
বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে এক নারী কর্মীকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র প্রশাসনিক বিতর্ক। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সোলায়মান মাসুমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে এক নারী সহকর্মীকে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ও প্রশাসনিকভাবে চাপে রাখার। ভুক্তভোগী পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা উম্মে হাবিবা ছন্দা দাবি করেছেন, ছুটি চাওয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসা সনদ জমা দেওয়া পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ), বিভাগীয় মামলা, বেতন বন্ধ এবং বদলি আটকে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নথিপত্র, চিকিৎসা সনদ ও দাপ্তরিক কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ঘটনাটি এখন কেবল একটি দাপ্তরিক বিরোধ নয়; বরং একজন নারী কর্মীর স্বাস্থ্য, মাতৃত্ব এবং চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০ জুলাই ২০২৫ তারিখে এক দুর্ঘটনায় আহত হন উম্মে হাবিবা ছন্দা। এরপর অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ ডা. মো. ফেরদৌস রায়হান তাকে শারীরিক আঘাতের কারণে বিশ্রামের পরামর্শ দেন।ভুক্তভোগীর দাবি, ওই ঘটনার পর তার গর্ভপাত ঘটে এবং তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তবে সেই পরিস্থিতিতেও ছুটি পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে দপ্তরে জটিলতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে আবার গর্ভধারণ করেন তিনি। ৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে গাইনোকোলজি ও অবস্ বিশেষজ্ঞ ডা. তানিয়া আফরোজ তাকে পরীক্ষা করে জানান, তিনি “Threatened Abortion” অর্থাৎ গর্ভপাতের ঝুঁকিতে রয়েছেন। চিকিৎসক তাকে অন্তত এক মাস সম্পূর্ণ বেড রেস্টে থাকার পরামর্শ দেন। এ অবস্থায় তিনি ১১ জানুয়ারি থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত চিকিৎসাজনিত ছুটির আবেদন করেন।
ঘটনাটিকে আরও বিতর্কিত করে তোলে ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের একটি অফিস চিঠি। স্মারক নম্বরসহ পাঠানো ওই চিঠিতে উম্মে হাবিবা ছন্দাকে তার গর্ভধারণের স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়। একজন নারী কর্মীর ব্যক্তিগত মাতৃত্ব নিয়ে এভাবে প্রমাণ চাওয়াকে অনেকেই প্রশাসনিক সংবেদনশীলতার অভাব হিসেবে দেখছেন।
জবাবে উম্মে হাবিবা ছন্দা লিখেছেন, “আমার গর্ভকালীন স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আমার চাকরির চূড়ান্ত ক্ষতি না করা পর্যন্ত মহোদয় থামবেন না বলে মনে হচ্ছে।”
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ছুটির আবেদন করার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে একের পর এক কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) পাঠানো হয়। পরে বিষয়টি আরও কঠোর রূপ নেয় এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও দায়ের করা হয়।
তিনি দাবি করেন, অসুস্থতা ও চিকিৎসাজনিত ছুটির আবেদনকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা তাকে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে রেখেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজন নারী কর্মীর গর্ভকালীন জটিলতার বিষয়কে কেন্দ্র করে বিভাগীয় মামলা দেওয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো দীর্ঘ ছয় মাস বেতন বন্ধ রাখা। ভুক্তভোগীর দাবি, কোনো সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি ছাড়াই তার বেতন বন্ধ রাখা হয়েছে। সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে তদন্ত বা বিভাগীয় মামলা চললেও সাধারণত সম্পূর্ণ বেতন বন্ধ রাখা হয় না।এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন—কোন আইনের ভিত্তিতে একজন কর্মচারীর বেতন টানা ছয় মাস বন্ধ রাখা হলো?
উম্মে হাবিবা ছন্দা আরও অভিযোগ করেছেন, তিনি অন্যত্র বদলির আবেদন করলেও সেটি কার্যকর হতে দেওয়া হয়নি।
তার দাবি, বিষয়টি ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিজেই ঢাকায় অধিদপ্তরে গিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করেছেন, যাতে তার বদলি প্রক্রিয়া বন্ধ থাকে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, তাকে মেহেন্দিগঞ্জের একটি দুর্গম ও জরাজীর্ণ কোয়ার্টারে একা থাকার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল।
ভুক্তভোগীর ভাষায়, একজন নারী হিসেবে সেখানে একা থাকা আমার জন্য নিরাপত্তাহীন। তবে দপ্তরের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য হিসেবে দেখা হয়েছে বলে অভিযোগ।
অনুসন্ধানে পাওয়া কিছু নথিতে বেশ কিছু অসঙ্গতিও দেখা গেছে। পাক্ষিক সভায় উপস্থিত থেকেও তাকে অনুপস্থিত দেখিয়ে শোকজ করা হয়েছে। চিকিৎসা সনদ ও এক্স-রে রিপোর্ট জমা দেওয়ার পরও সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। শোকজের জবাব দেওয়ার আগেই বিভাগীয় মামলার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সোলায়মান মাসুমের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন অভিযোগে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বরিশালের স্থানীয় একটি পত্রিকায় ২০২৪ সালের ১৫ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, মেহেন্দিগঞ্জের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছে জিম্মি কর্মচারীরা। ওই প্রতিবেদনে অফিসে প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা ও কর্মচারীদের হয়রানির অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সোলায়মান মাসুমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাকে একাধিক প্রশ্ন করা হয়।
তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কোন কারণে উম্মে হাবিবা ছন্দাকে “স্ট্যান্ড রিলিজ” করা হয়েছে এবং এ সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো লিখিত অভিযোগ বা তদন্ত প্রতিবেদন রয়েছে কি না।
এছাড়া গর্ভপাতের ঘটনা জানার পরও কেন ছুটি দেওয়া হয়নি, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দেওয়া মেডিকেল ছুটির আবেদনকে কেন্দ্র করে কেন প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, এসব বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়। তবে এসব প্রশ্নের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো জবাব দেননি।
একই বিষয়ে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মাহবুব মোর্শেদের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
মেহেন্দিগঞ্জের এই ঘটনা এখন শুধু একটি অফিসের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। একজন নারী কর্মীর স্বাস্থ্য, মাতৃত্ব এবং চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক এখন পুরো বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগের আলোচনার কেন্দ্রে।



