বরগুনায় দরজা-জানালাহীন কলেজ ভবন, রাতে রাখা হয় গরু-ছাগল

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২০:৩৬, নভেম্বর ০৭ ২০২৬ মিনিট

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার হোগলাপাশায় পাকা সড়কের পাশে মাঝারি আকারের একটি মাঠ। এটির একপাশে সাত কক্ষের লম্বা আধা পাকা ভবন। দুটি ছাড়া অন্য কক্ষগুলোয় দরজা-জানালা কারা যেন খুলে নিয়ে গেছে। দরজাবিহীন কক্ষগুলোতে গরু-ছাগলের বর্জ্যের স্তূপ। দরজা আটকানো কক্ষগুলোর একটিতে পাঁচটি বেঞ্চ এবং অন্যটিতে ছড়ানো ছিটানো বইপত্র। এটি হোগলাপাশা কলেজ। তবে প্রতিষ্ঠানটির সাইনবোর্ড নেই।

এই কলেজ থেকে এ বছর তিনজন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে কেউ পাস করেননি। গত বছরও তিন পরীক্ষার্থী ছিলেন। তাদের একজন পাস করেছিলেন। গত শনিবার প্রকাশিত উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল অনুযায়ী হোগলাপাশা কলেজসহ বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ১১টি কলেজে কেউ পাস করেননি। ১১ কলেজে মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ৪৪ জন। তাদের সাতজন পরীক্ষা দিতে যাননি।

হোগলাপাশা গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কলেজে শিক্ষার্থী-শিক্ষক কারও পদচারণা নেই। স্থানীয় বাসিন্দা জাফর মুন্সী বলেন, দিনে মাঠে চরানো গরু-ছাগল রাতে আধা পাকা ভবনের মধ্যে রাখা হয়।

শুধু হোগলাপাশা কলেজ নয়, অন্য ১০টি কলেজও নানা সমস্যায় জর্জরিত। প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত হয়নি, পাঠদানের অনুমতি পেয়েছে। কাগজপত্রে শিক্ষক থাকলেও তাদের বেতন নেই। শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থী ভর্তি হন না। কলেজ কার্যক্রম শুরুর পর থেকে বছরের পর বছর এভাবেই চলছে। শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়নে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

হোগলাপাশা ছাড়া অন্য কলেজগুলো হচ্ছে ভোলা সদরের মেদুয়া কলেজ, লালমোহন উপজেলার রমাগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, চরফ্যাসন উপজেলার চরমনিকা জালাল আহমেদ কলেজ, বরগুনার বেতাগী উপজেলার কদভানু মেমোরিয়াল সেকেন্ডারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পটুয়াখালী সদরের আউলিয়াপুর সাবিনা আক্তার স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও মজিদবাড়িয়া কলেজ, গলাচিপা উপজেলার বিপিসি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পিরোজপুর সদরের কদমতলা জর্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নাজিরপুর উপজেলার দীঘিরজান স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায় অ্যাডভোকেট এইচ.আর.কে ফাউন্ডেশন কৃষি প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট অ্যান্ড কলেজ।

রাজনৈতিক কারণে কার্যক্রম বন্ধ! পাথরঘাটার হোগলাপাশা কলেজ ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রূপালী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. সুনীল চন্দ্র হাওলাদার। অধ্যক্ষ ছিলেন তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তফা গোলাম কবির। রাজনৈতিক কারণে তিনি বর্তমানে কারাগারে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক বাধায় কলেজটির কার্যক্রম বন্ধ বলে জানা গেছে। সোমবার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জহিদুল ইসলাম খানের সঙ্গে পাথরঘাটা বাজারে কথা হয়। তিনি জানান, বেতন না পাওয়ায় তারা কেউ কলেজে যান না। কাগজপত্রে শিক্ষক সাতজন, শিক্ষার্থী ১৪ জন।

সচল স্কুল, রুগ্‌ণ কলেজ শাখা কেউ পাস না করা ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছয়টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল। পরে উচ্চ মাধ্যমিক শাখা এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষকরা অন্যত্র চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা। কলেজে শিক্ষক না থাকায় এসএসসি পাসের পর বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অন্য কলেজে গিয়ে ভর্তি হন। তাই এসব প্রতিষ্ঠানে কলেজ শাখায় অনেক বছর ধরে শিক্ষার্থী সংকট চলছে।

বিপিসি স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মো. মেজবাহউদ্দিন মিলন বলেন, ‘কলেজ শাখায় একজন শিক্ষকও নেই। স্কুল শাখায়ও আটটি শিক্ষক পদ শূন্য। শিক্ষক না থাকায় স্কুলের এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা অন্য কলেজে ভর্তি হয়।’

পটুয়াখালীর আউলিয়াপুর সাবিনা আক্তার স্কুলে ২০২৩ সালে কলেজ শাখার কার্যক্রম শুরু হয়। ২০২৪ সালে প্রথমবার ১৮ জন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে পাঁচজন পাস করেন। গত বছর দুজন ও এ বছর একজন পরীক্ষা দিয়ে কেউ পাস করেননি।

এসএসসি পাস করাদের অর্ধেকও কেন কলেজ শাখায় ভর্তি হননি জানতে চাইলে শিক্ষক আবু তালেব বলেন, ‘কলেজ শাখায় আমি ছাড়া কোনো শিক্ষক নেই। যারা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন তাদেরও তৎপরতা নেই। অধ্যক্ষ হয়ে আমি বিপাকে আছি।’

পটুয়াখালীর মীর্জাগঞ্জ উপজেলায় বরিশাল-বরগুনা সড়কের পাশে মজিদবাড়িয়া কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০০২ সালে। লম্বা টিনশেড কলেজ ভবনের একাংশ বন্যায় বিধ্বস্ত হয়েছে। এ বছর একমাত্র পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। ২০০৩ সালের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে পরীক্ষার্থী ৯ জনের বেশি হয়নি।

প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ফারুক ইকবাল জানান, ফল বিপর্যয়ের জন্য তারাও বিব্রত। তবে তাঁর দাবি, কারিগরি শাখার শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করেছেন। ১৯ জনের মধ্যে তিনজন পাস করেছেন।

কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক জসিম উদ্দিন বর্তমানে বরিশাল বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে নোটিশ দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মান্নোয়নের অঙ্গীকারনামা দিয়েছে। এবার ১০ নভেম্বরের মধ্যে জবাব চেয়ে নোটিশ দেওয়া হবে। তাদের জবাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেব।’