বরিশাল নগরীতে ৫০ কোটি টাকায় হচ্ছে ১৬ ফুটসাল মাঠ

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২০:৩০, নভেম্বর ০৩ ২০২৬ মিনিট

বরিশাল নগরীতে শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে ১৬টি ফুটসাল মাঠ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি)। খেলার মাঠ উন্নতিকরণ প্রকল্পের আওতায় মাঠগুলো নির্মাণে সর্বোচ্চ ৫০ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে মাঠগুলোর তালিকা চূড়ান্ত করে প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে বিসিসি। সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও পরবর্তী প্রক্রিয়া শেষে দ্রুতই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হবে। মাঠগুলো নির্মিত হলে নগরীর শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি নতুন খেলোয়াড় তৈরির পথ সুগম হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিসিসি সূত্রে জানা গেছে, সরকারের ক্রীড়া উন্নয়ন ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দেশের সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে ফুটসাল মাঠ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রাথমিকভাবে ১৬টি মাঠ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মাঠগুলোতে সারফেস লেভেলিং, প্রাকৃতিক ঘাস স্থাপন, পেরিফেরাল ড্রেনেজ, এলইডি ফ্লাডলাইট, আধুনিক ওয়াশরুম ও গ্যালারির ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দিন ও রাতে খেলাধুলার পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত মাঠগুলোর মধ্যে রয়েছে নগরীর কাউনিয়া বিসিক মাঠ, আলেকান্দার পরেশ সাগর মাঠ ও কাউনিয়া হাউজিং মাঠসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খেলার মাঠ। এসব মাঠ উন্নয়নের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক খেলাধুলার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা করছে সিটি করপোরেশন। বরিশাল নগরীতে দীর্ঘদিন ধরে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার উপযোগী পর্যাপ্ত মাঠের সংকট রয়েছে। নগরীর বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী মাঠও বর্তমানে আগের মতো ব্যবহার উপযোগী নেই। ফলে নিয়মিত খেলাধুলা ও অনুশীলনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অনেক শিশু-কিশোর ও তরুণ খেলোয়াড়। স্থানীয় খেলোয়াড়দের ভাষ্য, একসময় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় মাঠ থাকায় শিশু-কিশোররা সহজেই খেলাধুলার সুযোগ পেত। কিন্তু দিন দিন মাঠের সংখ্যা ও ব্যবহারযোগ্যতা কমে যাওয়ায় সেই পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো মাঠে খেলাধুলার পরিবর্তে মেলা ও অন্যান্য আয়োজনের কারণে নিয়মিত অনুশীলন ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষুদে খেলোয়াড় রাকিব হাসিন বলেন, বরিশাল শহরের পরেশ সাগর মাঠ ও বিএম স্কুলের মাঠসহ বেশ কয়েকটি মাঠ একসময় নিয়মিত খেলাধুলার জন্য ব্যবহৃত হতো। কিন্তু বর্তমানে এসব মাঠের অবস্থা আগের মতো নেই। মাঠগুলো যথাযথভাবে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে খেলাধুলার পুরোনো পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। খেলোয়াড় শান্ত বলেন, ছোটবেলায় এলাকাভিত্তিক মাঠ থাকায় খেলাধুলার সুযোগ পাওয়া যেত। কিন্তু এখন মাঠের সংকটের কারণে সেই সুযোগ কমে গেছে। এলাকাভিত্তিক মাঠ তৈরি করা হলে তরুণ প্রজন্ম উপকৃত হবে। আরেক ক্ষুদে খেলোয়াড় শহিদুল বলেন, বর্তমানে অনেক শিশু মোবাইল ফোনে বেশি সময় কাটায়। এলাকায় ভালো খেলার মাঠ তৈরি হলে তারা নিয়মিত খেলাধুলা ও অনুশীলনের সুযোগ পাবে। এতে শিশুদের মানসিক বিকাশের পাশাপাশি পড়াশোনাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিসিসির সম্পত্তি শাখার কর্মকর্তা মো. শাকিল আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির আওতায় খেলার মাঠ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বরিশাল নগরীতে ১৬টি মাঠ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে মাঠগুলোর ডিপিপি তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সর্বোচ্চ ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে মাঠগুলো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, মাঠগুলোতে দিনে ও রাতে খেলাধুলার উপযোগী পরিবেশ, আলোকসজ্জা, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও গ্যালারিসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বরিশাল জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, একজন খেলোয়াড় তৈরির পেছনে মাঠের গুরুত্ব অনেক। যত বেশি খেলার মাঠ থাকবে, তত বেশি খেলোয়াড় উঠে আসার সুযোগ তৈরি হবে। বরিশাল থেকেও অনেক খেলোয়াড় জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন। তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে মাঠের উন্নয়ন জরুরি। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, সরকার খেলাধুলার উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে বরিশাল নগরীতে ১৬টি ফুটসাল মাঠ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিশু-কিশোরদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে এবং মোবাইল ফোন ও মাদকের আসক্তি কমাতে খেলাধুলার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রথমে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে মাঠ তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও প্রাথমিক পর্যায়ে ১৬টি মাঠ নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি নগরীর বর্ধিত এলাকাগুলোতে বড় খেলার মাঠ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। বরিশাল স্টেডিয়ামের পাশাপাশি আরও একটি বড় মাঠের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি। প্রশাসক আরও বলেন, নদীতীরবর্তী এলাকায় সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য খেলার মাঠ তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সম্প্রতি বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, সরকার দেশের ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়েও স্টেডিয়াম নির্মাণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তিনি জানান, বর্তমানে ২০১টি উপজেলা স্টেডিয়ামের কার্যক্রম চলছে। পর্যায়ক্রমে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের ৫০৩টি উপজেলায় উপজেলা স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে ফুটসাল মাঠ নির্মাণের উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলায় আগ্রহী করে তুলবে বলেও আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। সংশ্লিষ্টদের মতে, বরিশাল নগরীতে প্রস্তাবিত ১৬টি ফুটসাল মাঠ নির্মাণ ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে মাঠের সংকট অনেকটাই কমবে। পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিনোদন, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ খেলোয়াড় তৈরিতে উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।