বরিশালে বিয়ের প্রলোভনে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ, ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে বিচার চেয়ে নারীর অনশন

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২০:৫৫, অক্টোবর ২৯ ২০২৬ মিনিট

 বরিশালের গৌরনদী উপজেলার টরকী বন্দর এলাকায় প্রেমের সম্পর্ক, বিয়ের প্রতিশ্রুতি এবং অর্থ লেনদেনকে কেন্দ্র করে এক নারীকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আরাফাত রহমানের বিরুদ্ধে। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং মোটরসাইকেল কেনাসহ বিভিন্ন অজুহাতে ওই নারীর কাছ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী নারী। এ ঘটনায় বিয়ে, অর্থ ফেরত এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে অনশন করার পাশাপাশি গৌরনদী মডেল থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বরিশাল জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এবং গৌরনদী উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আলহাজ আবুল হোসেন মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষ নিয়ে বিষয়টি আপস-মীমাংসার চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য নথি যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ অনুযায়ী, আরাফাত রহমানের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। এ সময় মোটরসাইকেল কেনা এবং বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা বলে বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয় বলে দাবি করেন ওই নারী।

ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিয়ের বিষয়টি সামনে এলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে বলে অভিযোগ তাঁর। একপর্যায়ে তিনি নিজেকে প্রতারিত মনে করে বিয়ে, অর্থ ফেরত এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হন।

তবে অর্থ লেনদেনের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, টাকা দেওয়ার তারিখ, লেনদেনের মাধ্যম এবং বিয়ের প্রতিশ্রুতিসংক্রান্ত যোগাযোগের প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত আরাফাত রহমানের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

বিয়ের দাবিতে অনশন, থানায় অভিযোগ অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে ওই নারী বিয়ের দাবিতে অনশন করেন বলে জানা গেছে। তাঁর দাবি, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্পর্ক স্থাপন এবং বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ নেওয়ার ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে তিনি এ অবস্থান নিয়েছেন।

এ ঘটনায় তিনি গৌরনদী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগের পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে থানায় দায়ের করা অভিযোগের কপি, মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ার তথ্য এবং তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ দায়ের হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে উভয় পক্ষের বক্তব্য, সম্ভাব্য সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আপোষ-মীমাংসার চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন এ ঘটনায় বিএনপি নেতা আলহাজ আবুল হোসেন মিয়ার নাম আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অভিযুক্ত আরাফাত রহমানের পক্ষ নিয়ে বিষয়টি আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করছেন। ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের দাবি এবং অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এ ধরনের উদ্যোগের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন। তবে আলহাজ আবুল হোসেন মিয়া অর্থের বিনিময়ে অভিযুক্তকে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন—এমন কোনো দাবি প্রমাণিত তথ্য ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ লেনদেনের প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, যোগাযোগের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাখ্যা জরুরি।

যদি কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে বাধা সৃষ্টি করেন, তবে তা অবশ্যই তদন্তের বিষয় হতে পারে। একইভাবে, অভিযোগের বাইরে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে সংবাদ প্রকাশ করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের প্রশ্ন ঘটনাটি নিয়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো বা তাঁদের জড়িয়ে নতুন পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য, প্রমাণ কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণ, অনৈতিক সুবিধা নেওয়া কিংবা মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ থাকলে সেটিও প্রমাণসহ যাচাই করা দরকার। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি বা তাঁদের পেশাগত কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা উচিত।

ঘটনার সব পক্ষের বক্তব্য, যোগাযোগের রেকর্ড এবং প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই ছাড়া কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দোষারোপ করা সমীচীন নয়।

অভিযুক্ত আরাফাত রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আরাফাত রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়ায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। অভিযোগ অস্বীকার করা, ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়া কিংবা নিজের অবস্থান তুলে ধরার অধিকার তাঁর রয়েছে।

বিএনপি নেতা আলহাজ আবুল হোসেন মিয়ার বক্তব্যও মেলেনি অভিযোগের বিষয়ে আলহাজ আবুল হোসেন মিয়ার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে অর্থের বিনিময়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এবং তাঁর বক্তব্য—দুটিই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

পুলিশের বক্তব্য ও তদন্তের অগ্রগতি এ ঘটনায় গৌরনদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তারিক হাসান রাসেলের বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করা হলে তিনি মিটিংয়ে থাকার কথা জানিয়ে ফোন কেটে দেন বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ কারণে ঘটনার বিস্তারিত বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া অভিযোগের তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে। তবে এসব তথ্য থেকে পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্তে বাধা দিচ্ছে বা কোনো পক্ষকে রক্ষা করছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে কি না, তদন্তকারী কর্মকর্তা কে, কী ধরনের তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আইনগতভাবে পরবর্তী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া জরুরি।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি একজন নারী বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্পর্ক স্থাপন এবং অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তুললে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগের পক্ষে ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার লেনদেনের তথ্য, বার্তা, কল রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ থাকলে সেগুলো আইনানুগভাবে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব যেন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তকে প্রভাবিত না করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ভুক্তভোগী নারী যেন নিরাপদ পরিবেশে তাঁর অভিযোগ জানাতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করা দরকার। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে কাউকে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত না করা—দুটিই ন্যায়বিচারের অংশ।

গৌরনদীর টরকী বন্দরের এ ঘটনায় এখন প্রধান প্রশ্ন হলো—অর্থ লেনদেন ও বিয়ের প্রতিশ্রুতিসংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা কী, থানায় দায়ের করা অভিযোগের তদন্ত কতদূর এগিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রামাণ্য তথ্য এবং সব পক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে।