বরিশালে সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ, নেট মিটারিংয়ে বিল সাশ্রয়ের অপেক্ষা

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২১:১২, অক্টোবর ২১ ২০২৬ মিনিট

বরিশাল বিভাগের সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের পুরো সুবিধা এখনো নিশ্চিত হয়নি। বিভাগটির বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ঝালকাঠি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মোট ২১০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এ জন্য ব্যয় হয়েছে ৪১ লাখ ২১ হাজার টাকা। পাশাপাশি বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ২০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা। তবে বরিশাল বিভাগের সব জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতার তথ্য পাওয়া যায়নি। বরিশাল ও ভোলা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সক্ষমতার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। অন্যদিকে, ঝালকাঠিতে বরাদ্দ থাকলেও তা ব্যয় করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। শুধু বরিশাল বিভাগ নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মোট উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ০৭ মেগাওয়াটে। এসব ব্যবস্থা পুরোপুরি কাজে লাগানো এবং নেট মিটারিং কার্যকর করা গেলে বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরশীলতাও কমানো সম্ভব হবে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বরগুনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ৬০ কিলোওয়াট এবং পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ঝালকাঠি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ৫০ কিলোওয়াট করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবস্থা রয়েছে। চার জেলার এই ব্যবস্থার সম্মিলিত সক্ষমতা ২১০ কিলোওয়াট। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ২০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর জন্য ব্যয় হয়েছে ৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা। তবে বরিশাল ও ভোলা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিভাগটির সব সরকারি কার্যালয়ে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি বাস্তবায়নের অগ্রগতিবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত দেশের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোতে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মোট সক্ষমতা ৪ হাজার ৬৬৩ কিলোওয়াট। পাঁচটি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে এ সক্ষমতা ৪০৫ দশমিক ৫ কিলোওয়াট। সব মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা ৫ হাজার ৬৮ দশমিক ৫ কিলোওয়াট বা প্রায় ৫ দশমিক ০৭ মেগাওয়াট। কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারিভাবে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোতে এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা। খুলনা বিভাগে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৭৪ লাখ ৬৩ হাজার, রংপুরে ২ কোটি ৮ লাখ ৫২ হাজার, রাজশাহীতে ২ কোটি ৪৮ লাখ ৯৯ হাজার, সিলেটে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৮ হাজার এবং চট্টগ্রামে ১ কোটি ২৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। এ ছাড়া খুলনা, রংপুর, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল বিভাগের কমিশনারের কার্যালয়গুলোতেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সক্ষমতা ও ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি। ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ভাড়া ভবনে পরিচালিত হওয়ায় সেখানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ক্যাপেক্স মডেলে এসব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে দিনের বেলায় সরকারি কার্যালয়গুলোর নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। তবে নেট মিটারিংয়ের অনুমোদন ও সংযোগ-সংক্রান্ত কিছু প্রক্রিয়া এখনো চলমান থাকায় উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুতের বিপরীতে বিল সমন্বয়ের সুযোগ পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। নেট মিটারিং চালু হলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে। এর বিপরীতে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিল সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হবে। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) শরীয়তপুর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সেখানকার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২৪ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। নেট মিটারিংয়ের আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকায় অতিরিক্ত বিদ্যুতের বিপরীতে বিল সমন্বয় এখনো শুরু হয়নি। ওজোপাডিকোর তথ্য অনুযায়ী, শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রতি মাসে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৫ হাজার ইউনিট। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর পর প্রতি মাসে প্রায় ৮০০ ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এতে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার প্রয়োজন কমছে এবং বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হচ্ছে। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের ছাদে স্থাপিত ৫ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা জাতীয় পর্যায়ে খুব বড় অবদান না রাখলেও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে সরকারি ও বেসরকারি অন্যান্য ভবনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। তিনি বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসারে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ পর্যায়ে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে নেট মিটারিং সংযোগ দিতে দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও নেট মিটারিং সংযোগের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগের আওতায় মেহেরপুরে ইতোমধ্যে ৮০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর বিদ্যুতের চাহিদাজনিত চাপ কমাতে সহায়তা করবে। বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই। সরকারের ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’-এ ২০৩০ সালের মধ্যে সাড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট আসার কথা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ১ হাজার ৬৪২ মেগাওয়াট। সরকারি ভবনের ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা, নেট মিটারিং দ্রুত কার্যকর করা এবং যেসব কার্যালয়ে এখনো ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়নি সেখানে উদ্যোগ সম্প্রসারণ করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আরও অগ্রগতি সম্ভব হবে।’