নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভোলায় চলছে মা ইলিশ শিকার, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
নিজেস্ব প্রতিবেদক|২১:০৬, অক্টোবর ১৭ ২০২৬ মিনিট
ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে থামছে না ইলিশ শিকার। চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে মা ইলিশ রক্ষা কর্মসূচির আওতায় গত ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ দিন নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নদীর অভয়াশ্রমে সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশাসনের ‘ঢিলেঢালা’ ভূমিকা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) পর্যন্ত ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ ধরার অভিযোগে পরিচালিত অভিযানে অর্ধশতাধিক জেলেকে আটক করা হয়েছে। মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এসব অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৫১টি মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং ৩৫ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় কয়েকজনকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। উদ্ধার করা ইলিশ বিভিন্ন এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১ লাখ ৭০ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে। আটক কয়েকটি নৌকা নিলামে বিক্রি করে পাওয়া অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন।
এর আগে গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় মৎস্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পৃথক অভিযান চালায়। ভোলা সদর উপজেলায় ১৭ জন জেলেকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানা করা হয়। এ সময় তিনজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। অভিযানকালে তিনটি নৌকা, ১০ কেজি ইলিশ ও ২৫ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়। দৌলতখান উপজেলায় তিনজন অপ্রাপ্তবয়স্ক জেলেকে মুচলেকা নিয়ে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি একটি নৌকা, ১৫ কেজি ইলিশ ও ১ লাখ মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে। তজুমদ্দিন উপজেলায় ১০ জন জেলেকে আটক করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁদের কাছ থেকে দুটি নৌকা, ছয় কেজি মাছ ও ২০ হাজার মিটার জাল উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে চরফ্যাশন উপজেলায় আটক আটজনের মধ্যে ছয়জনকে কারাদণ্ড এবং দুজনকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ অভিযানে ১০ কেজি ইলিশ ও ২২ হাজার মিটার জাল জব্দ করে পুলিশ ও মৎস্য বিভাগ।
মৎস্য বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোলার সাতটি উপজেলায় সরকারি নিবন্ধনভুক্ত জেলের সংখ্যা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩১২ জন। তবে চলতি বছর ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে খাদ্যসহায়তা হিসেবে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫৬ জন জেলের জন্য ৩ হাজার ৫৯১ দশমিক ৪ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজেলাভিত্তিক বরাদ্দের মধ্যে ভোলা সদরে ৫২৫ টন, দৌলতখানে ৫০০ টন, বোরহানউদ্দিনে ৪৩০ টন, তজুমদ্দিনে ৪৩২ দশমিক ৫ টন, লালমোহনে ৫২৫ টন, চরফ্যাশনে ৮৯১ দশমিক ৪ টন এবং মনপুরায় ২৮৭ দশমিক ৫ টন চাল রয়েছে। প্রতি জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা থাকলেও নিবন্ধিত হয়েও ২৩ হাজার ৬৫৬ জন জেলে এ সহায়তার বাইরে থাকছেন। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বরাদ্দ করা চালের ৫০ শতাংশ ইতিমধ্যে জেলেদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।
এদিকে ভোলার সাতটি উপজেলার নদীবেষ্টিত এলাকায় মাছ ধরে প্রায় তিন লাখ জেলে জীবিকা নির্বাহ করেন। অথচ সরকারি নিবন্ধনে তাঁদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন মাত্র ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩১২ জন। উপজেলাভিত্তিক হিসাবে ভোলা সদরে ২২ হাজার ২৫২ জন, দৌলতখানে ২১ হাজার ৫০২ জন, বোরহানউদ্দিনে ১৯ হাজার ৩৫০ জন, তজুমদ্দিনে ১৮ হাজার ৭১৭ জন, মনপুরায় ১৬ হাজার ৪০০ জন, লালমোহনে ২৪ হাজার ৮০৬ জন এবং চরফ্যাশনে ৪৪ হাজার ২৮৫ জন জেলে নিবন্ধিত রয়েছেন।
স্থানীয় মাঝিরা জানান, প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে জেলেরা আর্থিক কষ্টের মধ্যেও তা মেনে চলেন। তবে নিষেধাজ্ঞার সময় তাঁদের দুরবস্থা ও পরিবারের ভরণপোষণের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায় না বলে অভিযোগ তাঁদের। কয়েকজন জেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চার-পাঁচ বছর আগে জেলে কার্ড পেলেও এখন পর্যন্ত সরকারি চাল পাননি তাঁরা। প্রতিবছর চাল পাওয়ার আশায় ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়। পরিষদ থেকে জানানো হয়, সবার নামে বরাদ্দ আসেনি। ফলে সংসারের খরচ চালাতে বাধ্য হয়ে ধারদেনা করতে হচ্ছে তাঁদের।
পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের জংষন গ্রামের জেলে আবুল কালাম মাঝি বলেন, নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন মাছ ধরতে না পারায় কোনো আয় থাকবে না। এ অবস্থায় পরিবারের খরচ চালানো এবং ব্যাংক ও এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তাঁরা। জাল ও নৌকা কেনার জন্য প্রায় সব জেলেকেই ব্যাংক কিংবা এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। তাই নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে জেলেদের আর্থিক চাপ কমাতে ব্যাংক ও এনজিওর কিস্তি আদায় বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জেলেরা।
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, চলতি বছর দ্রুততম সময়ের মধ্যে জেলেদের মধ্যে চাল বিতরণের কার্যক্রম চলছে। কোনো জেলে যেন নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম চাল না পান, সে জন্য মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালে এনজিওগুলোর কিস্তি আদায় বন্ধ রাখার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। মৎস্য অভিযানে জনবল ও প্রয়োজনীয় সহায়তার কিছুটা ঘাটতি থাকলেও ইলিশের প্রজনন নিশ্চিত করতে কঠোর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে এবং দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।