সমালোচনার মুখে শিক্ষকের পা ধরে সেই শিক্ষার্থীর ক্ষমা প্রার্থনা

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২১:০৬, অক্টোবর ১৩ ২০২৬ মিনিট

তুমুল আলোচনা-সমালোচনার মুখে বরিশাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর তপন কুমার সাহার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন সেই শিক্ষার্থী। প্রাইমেরি শাখা খোলার খবরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির গুটিকয়েক শিক্ষার্থী সোমবার আন্দোলন শুরু করে এবং এনিয়ে অধ্যক্ষের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের একটি ভিডিওচিত্র ছড়িয়ে পড়ে। একজন শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীর এমন আচরণের ভিডিওটি এবং ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় তোলপাড়। বিশেষ করে সুশীলসমাজ-সাংবাদিক এবং শিক্ষকেরা এই ঘটনাকে লজ্জাজনক ও ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয় হিসেবে তুলে ধরে বেয়াদব শিক্ষার্থীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার জোরালো দাবি জানিয়েছেন। এতে পরিবেশ বেগতিক হয়ে উঠলে একদিনের মাথায় মঙ্গলবার সেই আলোচিত শিক্ষার্থী আন্দোলনরতদের নিয়ে অধ্যক্ষ তপন কুমার সাহার কাছে গিয়ে পা ধরে ক্ষমা চেয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, বেলসপার্কসংলগ্ন বরিশাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রাইমেরী শাখা চালুর খবরে সোমবার দ্বাদশ শ্রেণির ওই ছাত্রের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অধ্যক্ষ প্রফেসর তপন কুমার সাহার সাথে তর্ক এবং বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা। তখন দ্বাদশ শ্রেণির ওই শিক্ষার্থীকে আঙ্গুল উচিয়ে অধ্যক্ষকে হুমকি দিতে দেখা যায়, যার ভিডিওচিত্র সাংবাদিকেরা ক্যামেরায় ধারন করেন। সেই ভিডিও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সমাজপাতায় ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় বিতর্ক। বিশেষ করে বিএম কলেজের সাবেক এই শিক্ষকের সাথে এমন রূঢ় আচরণের ঘটনায় সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন সাবেক শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ, যারা এখন প্রশাসন-সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত আছেন। একপর্যায়ে ওই শিক্ষার্থীদের বেয়াদব আখ্যায়িত করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়ারও জোর দাবি ওঠে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পারিবারিক এবং সামাজিক শিক্ষা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। সূত্র জানিয়েছে, ২০০৭ সালে মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে তৃতীয় শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতো। কিন্তু সাবেক জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন দায়িত্বে থাকাকালীন ২০২৬ সালে প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করা হয়। কয়েকদিন আগে প্রতিষ্ঠানের একটি অনুষ্ঠানে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন প্রধান অতিথি হয়েছিলেন। তখন তিনি অভিভাবকদের দাবির প্রেক্ষিতে আবারও প্রাথমিক শাখা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এনিয়ে কজন শিক্ষকের উস্কানিতে শিক্ষার্থীরা বেসামাল হয়ে উঠে এবং অধ্যক্ষের সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছে। সেখানে গিয়ে এই শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন বরিশাল মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ¦ায়ক আফরোজা খানম নাসরিন, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে। শিক্ষকের সাথে অসদ আচরণের এই ঘটনা নিয়ে সোমবার রাতভর ফেসবুকে নেতিবাচক লেখালেখি হলেও ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে। এবং এ ঘটনার নেপথ্য কুশীলব একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশ কজন সিনিয়র শিক্ষক ও বরিশাল মহানগর বিএনপি নেত্রীর নাম সামনে আসে। সূত্র বলছে, স্থানীয় রাজনীতি নিয়ে সিটি প্রশাসক বিএনপি নেত্রী বিলকিস জাহান শিরিন এবং নাসরিনের মধ্যেকার সম্পর্ক সাপেনেউলে। কোথায় সিটি প্রশাসক হস্তক্ষেপ রাখলে নাসরিনও সেখানে অতিউৎসাহী হয়ে ওঠেন। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করে, মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ অধ্যক্ষ হেনস্তার এই ঘটনাটি সরকারের উচ্চমহলের নজরে গিয়েছে এবং এর নেপথ্য অনুঘটক কারা তা অনুসন্ধানে নির্দেশনা আসতে পারে। সম্ভব্য বিপদের আলামত পেয়ে আড়ালের কুশীলবেরা সোমবার রাতের পরিবেশ পর্যবেক্ষক পরবর্তী শিক্ষার্থীদের দিয়ে ক্ষমা চাইয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছেন। দ্বাদশ শ্রেণির সেই শিক্ষার্থী মঙ্গলবার অধ্যক্ষের কাছে ক্ষমা চাইতে গিয়ে বলেন, সোমবার তারা উত্তেজিত ছিলেন, নিজেদের কন্ট্রোল করতে পারেননি। বিষয়টি পরবর্তীতে উপলব্ধি হয় এবং এর জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। আলোচিত শিক্ষক অধ্যক্ষ তপন কুমার সাহা সাংবাদিক ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের ক্ষমা করে দেন এবং তাদের ক্লাসে ফিরতে নির্দেশ দেন। সরকারি ব্রজমোহন কলেজের সাবেক এই শিক্ষক সৎ এবং পরিচ্ছন্ন হিসেবে সমাধিক পরিচিত। এই পুরো ঘটনায় তার ভাষ্য হচ্ছে, ২০০৭ সালে মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে তৃতীয় শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। কিন্তু সাবেক জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন দায়িত্বে থাকাকালীন ২০২৬ সালে প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করা হয়। কয়েকদিন আগে প্রতিষ্ঠানের একটি অনুষ্ঠানে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন প্রধান অতিথি হয়ে আসলে তখন তার কাছে অভিভাবকদের তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি ব্যবস্থার দাবি রাখেন। সেই দাবির প্রেক্ষাপটে আবারও প্রাথমিক শাখা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এনিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আন্দোলন করতে গিয়ে উদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করেছিল। প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টদের দাবি, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ভুল বুঝিয়ে একটি পক্ষ ফায়দা হাসিল করতে চেয়েছিল। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ এবং সংবাদমাধ্যমের জোরালো প্রতিবাদের মুখে সেই ষড়যন্ত্র ধোপে টেকেনি। মঙ্গলবার সেই শিক্ষার্থীরা অভিভাবক সহকারে এসে অধ্যক্ষের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন, তিনিও তাদের মন থেকে মার্জনা করেছেন। প্রাসঙ্গিক এই বিষয়ে অধ্যক্ষ তপন কুমার সাহার বক্তব্য হচ্ছে, ‘সবাই আমার সন্তানের মতো। আমার সন্তান তাদের চেয়ে অন্তত ৫-৬ বছরের বড়। সন্তান অনেক সময় বাবা-মায়ের সাথে ভুল-ত্রুটি করে থাকে, তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। শিক্ষকের এই ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়টি নীতিবিবর্জিত সমাজে অনুকরণীয় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল— এমনটি মন্তব্য পাওয়া গেছে।’