মেধাতালিকায় দ্বিতীয় ফয়জুল পাননি নিয়োগপত্র, ভেরিফিকেশনে বাদ

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২১:৩১, অক্টোবর ১১ ২০২৬ মিনিট

‘আমি ৩২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারলাম না। বাবা-মাকে কিছু দিতে পারলাম না। পুরো সংসারটা আমার ওপর নির্ভরশীল। একটু ঘুমাতে গেলেই মনে হয় কেউ যেন বলছে—তোমার নিয়োগপত্র এসে গেছে, তুমি কেন ঘুমাচ্ছ? এখন আমি কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই নিজের আক্ষেপ আর হতাশার কথা প্রকাশ করছিলেন মো. ফয়জুল আলম।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে লালমোহন উপজেলায় মেধাক্রমে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেও নিয়োগপত্র পাননি মো. ফয়জুল আলম। তিনি ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার চরটিটিয়া গ্রামের বাসিন্দা।

ভোলা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ২৫৬ জন চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হন, যার মধ্যে লালমোহন উপজেলায় উত্তীর্ণ হন ৪৩ জন। উপজেলাটিতে একমাত্র ফয়জুল আলম ছাড়া বাকি ৪২ জনই নিয়োগপত্র পেয়েছেন।

জানা যায়, প্রথম ধাপে সারা দেশের ৬১টি জেলায় ১৪ হাজার ৩৮৪ জন চূড়ান্ত সুপারিশ পান। তবে ফয়জুলসহ আরও অনেকের নাম প্রথম গেজেটে না আসায় বঞ্চিত শিক্ষকেরা ঢাকায় আন্দোলন শুরু করেন এবং বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে বাদ পড়াদের তালিকা সংশোধন করে দ্বিতীয় দফায় পুনর্নিয়োগের গেজেট প্রকাশ করা হয়। লালমোহন উপজেলা থেকে কাগজপত্র জমা দেওয়া বাকি সবার নাম দ্বিতীয় গেজেটে আসলেও রহস্যজনকভাবে ফয়জুলের নাম বাদ পড়ে যায়। পরে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে যোগাযোগ করে তিনি জানতে পারেন, পুলিশ ভেরিফিকেশনে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের একটি সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে ফয়জুল আলমের মতো আরও অনেক প্রার্থীকে পুলিশ ভেরিফিকেশনে আটকে দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী মো. ফয়জুল আলম বলেন, ‘উপজেলায় মেধাতালিকায় আমি দ্বিতীয় হয়েছি। আমার সব কাগজপত্র সঠিক আছে। শিক্ষাদপ্তর থেকে বলা হয়েছে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে আমাকে নাকি বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমি বা আমার পরিবারের কোনো সদস্য কখনোই কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।’

হতাশা ব্যক্ত করে ফয়জুল আরও বলেন, ‘আগে একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। প্রাইমারিতে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ায় সেই চাকরিটাও ছেড়ে দিই। এখন আমি পুরোপুরি বেকার। পরিবারে স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা ও ভাই-বোন রয়েছে। এর আগে তিনবার পরীক্ষা দিয়ে বাদ পড়েছিলাম, তখন আক্ষেপ ছিল না। কিন্তু এবার চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পেয়েও ভেরিফিকেশনের বেড়াজালে আটকে গেলাম। আমার সরকারি চাকরির বয়সও শেষ হয়ে গেছে।’

ফয়জুলের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা বা অপরাধের রেকর্ড নেই। মেধার ভিত্তিতে সব ধাপ অতিক্রম করার পরও অস্বচ্ছ ভেরিফিকেশনের নামে এমন হয়রানি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অন্যায় ছাড়া আর কিছুই নয়। এ অবস্থায় মানবিক বিবেচনায় নিয়োগপত্র পাওয়ার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী, ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এবং শিক্ষা মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

ঘটনার বিষয়ে ভোলা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘লালমোহনে একজন, চরফ্যাশনে দুজন এবং ভোলা সদরে একজনসহ ভোলা জেলায় মোট চারজন প্রার্থীর নিয়োগ আটকে আছে। আমরা এই চারজনের কাগজপত্র অধিদপ্তরে পাঠিয়েছি। অধিদপ্তর থেকে যে নির্দেশনা আসবে, সেই অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’