বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকূলে ৪৮ কোটি টাকায় ম্যানগ্রোভ বনায়ন

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২০:০২, অক্টোবর ০৭ ২০২৬ মিনিট

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ও প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে দেশের উপকূলীয় এলাকায় বড় ধরনের ম্যানগ্রোভ বনায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় এলাকায় ৪৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪ হাজার ৫০১ হেক্টর জমিতে এ বনায়ন করা হবে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বন অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে নেওয়া এ প্রকল্পের আওতায় বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের একাধিক উপকূলীয় জেলা ও উপজেলা-থানা এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চার বছর মেয়াদি প্রকল্পটির মাধ্যমে উপকূলকে একটি সবুজ বেষ্টনীর আওতায় আনার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

যেসব এলাকায় হবে বনায়ন

প্রকল্পের আওতায় বরিশাল বিভাগের বরিশাল সদর, পটুয়াখালী, দশমিনা, রাঙ্গাবালী, গলাচিপা, কলাপাড়া, বামনা, বরগুনা সদর, পাথরঘাটা, চরফ্যাশন, মনপুরা ও তজুমদ্দিন এলাকায় বনায়ন করা হবে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিভাগের হাতিয়া, সুবর্ণচর, কবিরহাট, রামগতি, হালিশহর, আকবরশাহ, বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড, কক্সবাজার, টেকনাফ ও মহেশখালী এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের শতভাগ কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে সমুদ্রতীরবর্তী চর ও নতুন জেগে ওঠা ভূমিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বনায়ন করা হবে।

ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস ঠেকাবে সবুজ দেয়াল

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো উপকূলীয় অঞ্চলে বনাচ্ছাদন বাড়িয়ে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সামুদ্রিক বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমানো। ম্যানগ্রোভ বন উপকূলীয় জনপদের জন্য প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে নতুন জেগে ওঠা চরকে স্থিতিশীল করা, ভূমিক্ষয় কমানো, নদী ও সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো এবং কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ঠেকাতেও এ বনায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ৪ হাজার ৫০১ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বনায়নের মাধ্যমে আগামী ২০ বছরে প্রায় ১১ লাখ ১৩ হাজার ১৯১ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড মজুত বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

ম্যানগ্রোভ বনায়নে বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের উপকূলীয় বনায়নের অভিজ্ঞতা পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের। সাধারণত সমুদ্রতীরবর্তী চর ও নতুন জেগে ওঠা চরে এ ধরনের বনায়ন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনায়নের যাত্রা শুরু হয় ১৯৬২ সালে। পোল্ডার বা বাঁধের বাইরে উপকূলীয় এলাকায় বনায়নের মাধ্যমে সামুদ্রিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে দেখা যায়, ম্যানগ্রোভ বনায়নের সুফল শুধু দুর্যোগ মোকাবিলাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি নতুন চর জেগে ওঠার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে, ভূমির স্থায়িত্ব বাড়ায়, নদী ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ করে এবং কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানির প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে।

নতুন চর স্থায়ী করতেও বড় ভূমিকা

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও কৃষিনির্ভর দেশে নতুন জেগে ওঠা চর স্থায়ী করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ম্যানগ্রোভ বনায়ন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে মেঘনা অববাহিকায় নদীবাহিত পলিমাটি জমে প্রতিনিয়ত নতুন ভূমি তৈরি হচ্ছে। মেঘনাসহ দেশের প্রধান নদীগুলো ও অসংখ্য শাখানদী থেকে আসা পলিমাটির মাধ্যমে গড়ে ওঠা এসব চর ভবিষ্যতে বসতি, কৃষি ও পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হতে পারে।

২ কোটি ম্যানগ্রোভের লক্ষ্যমাত্রা

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, উপকূলীয় জেলায় নতুন জেগে ওঠা চরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বনায়নের জন্য ১৯৭৭ সালের ২৪ মার্চ জারি করা সরকারি নোটিফিকেশনও প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার উপকূলীয় এলাকা ম্যানগ্রোভ বাগান সৃজনের জন্য উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া ‘পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচির আওতায় দুই কোটি ম্যানগ্রোভ বনায়নের যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে তার একটি বড় অংশ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

তৈরি হবে সবুজ কর্মসংস্থান

প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান। প্রকল্পের আওতায় বনায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণ যুক্ত হবে। প্রকল্প নথি অনুযায়ী, বনায়ন পাহারাদার হিসেবে ৮১ হাজার ১৮ জন/মাস এবং অনিয়মিত শ্রমিক হিসেবে প্রায় ৩ লাখ ৪১ হাজার জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফলে উপকূলীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় ও জীবিকার ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনায়নের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, বনায়নের জন্য নির্বাচিত জমির মালিকানা, দখল ও সরেজমিন বাস্তবতা আগে নিশ্চিত করা জরুরি। কাগজে উপযুক্ত জমি থাকলেও মাঠপর্যায়ে জমির অবস্থা ভিন্ন হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া ২০৩০ সালে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সৃজিত বনভূমির রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে হবে, কে দায়িত্ব নেবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বন রক্ষায় কী ধরনের ব্যবস্থাপনা থাকবে—সেটিও এখনই নির্ধারণের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিয়েও প্রশ্ন

প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু প্রশাসনিক ও পরিকল্পনাগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির কার্যবিবরণীতে প্রকল্পের আগের নাম ‘গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ বনায়ন প্রকল্প’ রয়ে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে প্রশাসনিক পর্যায়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্পটির যৌক্তিকতা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে জমি, পরিবেশ, সামাজিক প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও গভীর যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সবুজ দেয়াল কতটা টেকসই হবে?

বিশাল এই প্রকল্পের মাধ্যমে উপকূলে ম্যানগ্রোভের সবুজ দেয়াল গড়ে উঠলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও ভূমিক্ষয়ের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও সুফল মিলতে পারে। তবে প্রকল্পের সাফল্য শুধু গাছ লাগানোর সংখ্যায় নয়—গাছ বাঁচানো, বনভূমি রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করবে প্রকৃত সাফল্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩০ সালে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর যদি সৃজিত বনভূমি যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়, তাহলে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য এই ম্যানগ্রোভ বন একদিকে যেমন দুর্যোগের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হবে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখবে।’