জলবায়ু সুরক্ষা ও ক্ষতিপূরণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ৯ প্রস্তাব

দেশ জনপদ ডেস্ক | ২০:০৭, সেপ্টেম্বর ২৫ ২০২৬ মিনিট

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধ এবং জলবায়ু শরণার্থী বা বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি ৯টি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত ‘জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায্য উত্তরণ’ এবং ‘সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক পৃথক দুটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে তিনি এই প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন উপলক্ষে গত মঙ্গলবার ও বুধবার আরও বেশ কিছু কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সম্মেলনে বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতার ভয়াবহ চিত্র উপস্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের ভূমিকা ০.৫ শতাংশের চেয়েও কম, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিপর্যয়ে সর্বাধিক ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১২ থেকে ১৮ শতাংশ ভূখণ্ড সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যেতে পারে, যা কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ও অস্তিত্বকে চরম হুমকির মুখে ফেলবে। একা কোনো দেশের পক্ষে এই বৈশ্বিক সংকট সমাধান সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি নিছক প্রতিশ্রুতির বদলে অবিলম্বে অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপস্থাপিত ৯টি প্রধান রূপরেখা :

জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায্য উত্তরণ সম্মেলন থেকে (৫ প্রস্তাব) : ১. বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সীমা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত ও ব্যাপকভাবে কমানো।

২. জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য, নিশ্চিত ও পূর্বানুমেয় অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করা।

৩. পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে অনুন্নত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সুষম প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

৪. অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য শক্তি বা জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা।

৫. জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ‘ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিল’ (লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড)-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত অর্থপ্রবাহ বজায় রাখা।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বিষয়ক সম্মেলন থেকে (৪ প্রস্তাব) : ৬. পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ হ্রাস প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও ন্যায়সংগত করা।

৭. ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দেশের সুরক্ষায় জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি, উপাত্ত ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার বিস্তার ঘটানো।

৮. স্থানচ্যুতি ও ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা বহুগুণে বৃদ্ধি করা।

৯. জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গৃহহীন বা বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত ও মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।

বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সাফল্য ও চুক্তি : জাতিসংঘ অধিবেশনের পাশাপাশি কূটনৈতিক অঙ্গনে বেশ তৎপর ভূমিকা পালন করেন প্রধানমন্ত্রী :

স্বাস্থ্য ও কৃষি খাত (গেটস ফাউন্ডেশন) : ‘বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে কৃষি উৎপাদনের আধুনিকায়নে ‘স্মার্ট ফার্মার কার্ড’ বিতরণ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেশীয় প্রযুক্তিতে ভ্যাকসিন উৎপাদন ও ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়।

বাণিজ্য ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক (ক্রোয়েশিয়া ও পাকিস্তান) : ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেনকোভিচ এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে পৃথক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট (ইরান) : ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান- এর সঙ্গে ম্যানহাটনের বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত প্রায় ৮০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের নিরাপত্তা, জ্বালানি সংকটের সমাধান এবং হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা পরিবাহী নৌযানগুলো দ্রুত মুক্ত করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা চাওয়া হয়।

বিমান বহর সম্প্রসারণ (বোয়িং চুক্তি) : রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে নতুন ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে বিমানের বহরে নতুন মোট ২৫টি বোয়িং যুক্ত হচ্ছে।

জরুরি ও প্রযুক্তিগত শব্দের বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ ১. ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ (অর্থ : জলবায়ু সুরক্ষাভিত্তিক পদক্ষেপ এবং সুষম রূপান্তর।)

২. গ্রিনহাউজ গ্যাস এমিশনস (বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিগমন বা নির্গমন)।

৩. ভালনারেবল কান্ট্রিজ (প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ক্ষয়ক্ষতির অতি ঝুঁকিতে থাকা দেশসমূহ)।

৪. রিনিউয়েবল এনার্জি (নবায়নযোগ্য শক্তি বা জ্বালানি (যেমন : সৌর বিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ)।

৫. লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড ( জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান বাবদ সহায়ক তহবিল)।

৬. ডিসপ্লেসমেন্ট (ভিটেমাটি থেকে স্থানচ্যুতি বা বাস্তুচ্যুত হওয়া)।

৭. বাইলেটারেল মিটিং (দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক)।

৮. সার্কুলার ইকোনমি ( চক্রাকার অর্থনীতি (যেখানে বর্জ্য কমিয়ে সম্পদের পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করা হয়)।