বরগুনার উপকূলজুড়ে প্রতিদিনই দৃশ্যপট বদলে দিচ্ছে নদী ও সাগরের ভাঙন। কোথাও জোয়ারের পানিতে হারিয়ে যাচ্ছে সৈকতের অংশ, কোথাও ঢেউয়ের আঘাতে উপড়ে পড়ছে ঝাউগাছ। আবার কোথাও বেড়িবাঁধের মাটি সরে গিয়ে বাড়ছে জনপদ প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা। দীর্ঘদিনের এ ভাঙনে ইতোমধ্যে বসতভিটা, ফসলি জমি, সড়ক ও জীবিকার নানা অবলম্বন হারাচ্ছেন উপকূলের মানুষ।
বরগুনা সদর, তালতলী, পাথরঘাটা ও আমতলী উপজেলার বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বিষখালী নদীর অব্যাহত ভাঙনে সঙ্কুচিত হচ্ছে নলটোনা ইউনিয়ন। অন্যদিকে সাগরের ভাঙনে ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তালতলীর শুভসন্ধ্যা সৈকত ও সংলগ্ন ঝাউবন। ঢেউয়ের আঘাতে বালু সরে গিয়ে অনেক গাছের শিকড় বেরিয়ে পড়েছে। কোথাও গাছ উপড়ে পড়েছে, আবার কোথাও সৈকতের অংশ চলে গেছে পানির নিচে। লালদিয়া চরেও দেখা দিয়েছে ভাঙনের তীব্রতা। পর্যটনের সম্ভাবনাময় এসব এলাকা রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
নদী ও সাগরঘেঁষা বেড়িবাঁধ নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। অস্বাভাবিক জোয়ার, ঘূর্ণিঝড় ও নিম্নচাপের সময় দুর্বল বাঁধ দিয়ে পানি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে। বাঁধ ভেঙে বা উপচে পানি ঢুকে পড়লে দ্রুত প্লাবিত হয় বসতবাড়ি ও ফসলের মাঠ। লবণাক্ত পানি ঢুকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষিজমি ও মিঠাপানির উৎস।
স্থানীয় পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়, অস্বাভাবিক জোয়ার এবং ভূমিক্ষয়ের সম্মিলিত প্রভাবেই বরগুনার উপকূলের ঝুঁকি বাড়ছে। শুধু বাঁধ মেরামত করে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদী-সাগরের গতিপথ, ভাঙনের ধরন ও ঝুঁকিপূর্ণ জনপদ চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঝাউবন, ম্যানগ্রোভসহ প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থা রক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হান্নান প্রধান বলেন, “বরগুনার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আমরা সাধ্যমতো বাঁধ সুরক্ষার চেষ্টা করছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই বরগুনার জন্য কার্যক্রম শুরু করা যাবে।”
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভাঙন দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে সাময়িক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ফলে এক মৌসুমে মেরামত করা বাঁধ পরের মৌসুমেই আবার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
পরিবেশবিদদের মতে, বরগুনার উপকূল রক্ষায় এখনই সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা, টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ভাঙন পর্যবেক্ষণ, প্রাকৃতিক বনাঞ্চল সংরক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনপদের জন্য আগাম সুরক্ষা পরিকল্পনা নিতে হবে। অন্যথায় উপকূলীয় জনপদ, কৃষি ও জীবিকার ওপর ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়তে পারে।