বরগুনায় সাড়ে ১২ কোটি টাকার কাজে অনিয়ম, ধসে পড়ল আরসিসি প্ল্যাটফর্ম
বরগুনার আমতলী পৌর লেকের সৌন্দর্যবর্ধনে সাড়ে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ওয়াকওয়ের একটি আরসিসি ডেক প্ল্যাটফর্ম ধসে পড়েছে। নির্মাণকাজে স্টিলের পরিবর্তে বাঁশ ও কাঠের সাটারিং এবং ল্যাব পরীক্ষায় অনুমোদিত রডের পরিবর্তে নিম্নমানের রড ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
গত ৩০ আগস্ট ঢালাই চলাকালে পৌর লেকের নির্মাণাধীন ওয়াকওয়ের একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার পর সরেজমিন স্থানটি পরিদর্শন করে নির্মাণকাজে অনিয়মের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে দৃশ্যমান বলে জানান বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ। নির্মাণসামগ্রীর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লোকাল গভর্নমেন্ট কোভিড-১৯ রেসপন্স অ্যান্ড রিকভারি প্রজেক্টের (এলজিসিআরআরপি) আওতায় আমতলী পৌর লেকের সৌন্দর্যবর্ধনে ওয়াকওয়ে ও আরসিসি ডেক প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি ৫৬ লাখ ৯৮ হাজার ৩২৩ টাকা।
২০২৪ সালের ২৫ অক্টোবর প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। একই বছরের ৩০ জুলাই নির্মাণকাজ শুরুর কথা থাকলেও বাস্তবে কাজ শুরু হয় পরে। ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় থাকলেও সময়মতো তা শেষ করতে পারেনি ঝালকাঠির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইসলাম ব্রাদার্স। পরে বর্ধিত সময়ে নির্মাণকাজ চলছিল।
সরেজমিন আমতলী পৌরসভার নির্মাণাধীন ওয়াকওয়ে ঘুরে দেখা যায়, পুরোনো লেকের মাঝে মানুষের চলাচলের জন্য করা হচ্ছে সিমেন্টের ওয়াকওয়ে। কোথাও কাঠ আর গাছের খুঁটি করা হয়েছে সাটারিং। দৃশ্যমান দুটি প্ল্যাটফর্মের একটি প্রধান অংশ দেবে গেছে। ফলে বের হয়ে গেছে রড। তাই দেবে যাওয়া অংশে চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে রেখেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের শুরু থেকেই নির্মাণকাজে অনিয়ম করা হচ্ছে। আরসিসি প্ল্যাটফর্মের ঢালাইয়ের জন্য স্টিলের সাটারিং ব্যবহারের কথা থাকলেও ২০২৪ সালেই সেখানে গাছ ও কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকার ফলে রডেও মরিচা ধরেছে। এছাড়া পানির মধ্যে থাকায় সাটারিংয়ের কাজে ব্যবহৃত কাঠ ও গাছ পচে গিয়ে মূল স্ট্রাকচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আমতলীতে নির্মাণাধীন এই ওয়াকওয়ে একটি ‘বিলাসিতা’ বলে মন্তব্য করেন স্থানীয় বাসিন্দা মোমেন আকন। তিনি বলেন, ‘আমতলীতে এমনিই আমাদের উন্নয়নের অনেক ঘাটতি রয়েছে। তার মধ্যে এই প্রকল্প একটি বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই না। এর মধ্যেও প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রায় দুই বছর ধরে কাঠের সাটারিং ফেলে রাখা হয়েছিল। দীর্ঘসময় কাজ বন্ধ থাকায় রডে মরিচা পড়েছে। এখন ঢালাই দেওয়ার সময় নিচ দিয়ে পড়ে যাচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
স্থানীয় বাসিন্দা এইচ এম রাসেল বলেন, ‘প্রকল্পের শুরু থেকেই নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এলাকাবাসী বিষয়টি জানালেও কোনো প্রতিকার হয়নি। কয়েকদিন আগে ঢালাই চলাকালে একটি প্ল্যাটফর্ম ধসে পড়ে। মূলত দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় কাঠ ও গাছের খুঁটি নষ্ট হয়ে এগুলো দেবে গেছে।’
তবে নির্মাণকাজে কোনো গাফিলতি হয়নি বলে দাবি করেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি শেখ নোমান রেজা। তিনি বলেন, ‘এটা পানির ভেতরের কাজ। এ কাজের বিষয়ে আমাদের কোনো গাফিলতি নেই। তবে সাটারিংয়ের একটি কাঠ খুলে যেতে পারে বা একটি বাঁশ বাঁকা হয়ে এ ঘটনা ঘটতে পারে।’
খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ। এসময় তিনি বলেন, নির্মাণ কাজে ঢালাইয়ের জন্য যেসব সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে তার কোয়ালিটি দেখতে হবে। ল্যাব পরীক্ষার জন্য নমুনা সিলগালা করে পাথর বালু এবং অন্য সামগ্রী নেওয়া হয়েছে।
