দুই বছর ধরে অচল বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণাগার

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২২:০১, সেপ্টেম্বর ০৬ ২০২৬ মিনিট

নিজস্ব প্রতিবেদক : যন্ত্রপাতির ত্রুটির কারণে প্রায় দুই বছর ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় গবেষণাগার। ফলে পুরো বিভাগে পানির গুণগত মান ও দূষণ পরীক্ষা কার্যক্রম কার্যত থমকে গেছে। বর্তমানে তরল বর্জ্যসহ বিভিন্ন ধরনের পানির নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকার কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতে বিলম্ব হওয়ায় সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

দক্ষিণাঞ্চলের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০১০ সালে বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরে আধুনিক এ গবেষণাগারটি স্থাপন করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখান থেকে নিয়মিত পানি, বায়ু ও শব্দদূষণের মাত্রা পরিমাপ করা হতো।পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি সংগ্রহ করে তার গুণগত মান ও দূষণের মাত্রাও পরীক্ষা করা হতো।

তবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা ও বেশ কিছু যন্ত্র নষ্ট থাকায় ল্যাবটিতে নমুনা পরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এরই মধ্যে ২০২৪ সালের শেষ দিকে বরিশাল নগরের নথুল্লাবাদে পরিবেশ অধিদপ্তরের নিজস্ব নতুন ভবনে কার্যালয় স্থানান্তর করা হয়। নতুন ভবনে কার্যক্রম শুরু হলেও গবেষণাগারের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি এখনো স্থাপন করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ল্যাবটি কার্যত অকার্যকর হয়ে আছে।

বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের নমুনা সংগ্রহকারী সাইমুন হাসান বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক দপ্তরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বর্তমানে তরল বর্জ্যসহ বিভিন্ন নমুনা ঢাকার কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগারে পাঠাতে হচ্ছে। সেখানে নমুনার চাপ বেশি থাকায় পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতে অনেক সময় বিলম্ব হয়।

বিভাগীয় পরীক্ষাগারের সিনিয়র কেমিস্ট গোলাম কিবরিয়া জানান, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা ও নষ্ট যন্ত্রপাতির কারণে ল্যাবে কোনো নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ পানির নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নিয়ম অনুযায়ী বছরে অন্তত দুবার শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তরল বর্জ্যের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু বরিশালে পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় এসব নমুনা ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। এতে প্রতিবেদন পেতে দেরি হওয়ায় পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কাজী সাইফুদ্দীন বলেন, পরিবেশগত ছাড়পত্রে বিভিন্ন শর্ত দেওয়া থাকে। এসব শর্তের কোনোটি যদি ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে নির্ধারিত সময়ে তা সম্পন্ন করা প্রয়োজন। কিন্তু বরিশালের ল্যাব থেকে সময়মতো পরীক্ষা ও প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কাজগুলো যথাসময়ে সম্পন্ন করতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।

এদিকে জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত পরীক্ষায় বরিশাল নগর ও বিভিন্ন উপজেলার খাবার পানিতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে পানির ব্যবহার নিয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পরীক্ষা বন্ধ থাকায় বর্তমানে পানিদূষণের উৎস শনাক্ত ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যে বর্ষা মৌসুমে বিভাগজুড়ে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ায় জনমনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক মো. রেফায়াতুল হায়দার জানান, শুধু গত জুলাই মাসেই বরিশাল বিভাগে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ছাড়িয়েছে। ডায়রিয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলায় চর্মরোগসহ অন্যান্য পানিবাহিত রোগের বিস্তারে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় ও দুর্ভোগ দুটোই বেড়েছে।

ল্যাবটি দ্রুত সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, গবেষণাগারটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর জন্য প্রয়োজনীয় ৫১টি আধুনিক যন্ত্রপাতির বিস্তারিত তালিকা তৈরি করে অধিদপ্তরের সদর দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন করে পরীক্ষার কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।

এদিকে গবেষণাগারটি দীর্ঘদিন অচল থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় দ্রুত ল্যাবটি সচল করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাদের দাবি, পানির গুণগত মান ও দূষণ পরীক্ষা শুধু পরিবেশ সুরক্ষার বিষয় নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও জড়িত। তাই আর কোনো বিলম্ব না করে দ্রুত প্রকল্পের অনুমোদন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও গবেষণাগারের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করা জরুরি।