বরিশালে চিকিৎসকের হাতে চিকিৎসক লাঞ্ছিত, ভিডিও ভাইরাল

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২১:২৯, সেপ্টেম্বর ০৫ ২০২৬ মিনিট

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশালে এক অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের অপারেশনে বাঁধা দেয়ায় এনেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. শাওনকে শারীরিকভাবে  লাঞ্ছিত ও হেনস্তা করার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বরিশাল নগরীর আগরপুর রোডস্থ মিডটাউন হাসপাতালের এমবিবিএস চিকিৎসক আনোয়ার হোসেনের অনৈতিক অপারেশনের প্রতিবাদ করায় এ ঘটনা ঘটে। ডা. আনোয়ার হোসেন ওই হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। অনভিজ্ঞতার কারনে অপারেশন শেষ করতে না পারা রোগী রুবিনার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ভাইরাল হওয়া ভিডিও থেকে জানা যায়, বরিশাল নগরীর আগরপুর রোডস্থ বেসরকারি মিডটাউন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ডা. আনোয়ার হোসেন শুধুমাত্র এমবিবিএস পাশ করলেও ফ্যামিলি প্ল্যানিং এ কর্মরত থাকাকালীন থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত গাইনীসহ নানা রোগের সার্জারি করে থাকেন। দালালের মাধ্যমে নিজ মালিকানাধীন হাসপাতালে রোগী ভর্তি করিয়ে কম টাকার অজুহাতে নিজেই দেন এনেস্থেসিয়া। অপারেশন টেবিলে এমবিবিএস ডাঃ আনোয়ার হোসেন একজনই হয়ে উঠেন জটিল রোগের সার্জন ও এনেস্থেসিওলজিষ্ট। নিয়মিত অপারেশনও করেন তিনি। বিএমডিসির লগ বই অনুযায়ী সাধারণ এমবিবিএস ডাক্তার অপারেশন কার্যক্রমে একজন বিশেষজ্ঞ সার্জনের সাথে সহযোগী হিসেবে থাকতে পারবেন। তবে কোন অবস্থাতেই নিজে অপারেশন করতে পারবেননা। কিন্তু সেই নিয়ম নীতির তোয়াক্কাই করছেননা ডাঃ আনোয়ার। শুধু আপারেশন করেই ক্ষ্যান্ত নন তিনি, কোন বিশেষজ্ঞ এনেস্থেসিওলজিষ্টই রাখেননা তার অপারেশন টিমে। নিজেই সেই কাজটি সেড়ে ফেলেন।

হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, রোগীর কিছু টাকা বাঁচাতে মৃত্যু ঝুকিতে ফেলে দেন তিনি। নিজেই হাসপাতালের মালিক বিধায় কেউ তার এই অনৈতিক কাজের প্রতিবাদ করতে পারেননা। তবে এনেস্থেসিয়ার মত তার এই অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য এনেস্থেসিওলজিষ্টদের সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি অব এনেস্থেসিয়া, ক্লিনিক্যাল কেয়ার এন্ড পেইন ফিজিসিয়ান বরিশাল শাখার পক্ষ থেকে লিখিত আকারে একাধিকবার সতর্ক করা হয়। তবুও থেমে থাকেনি তার অপারেশন টেবিলে দ্বৈত ভুমিকার।

বুধবার তার এরকম একটি অনৈতিক কর্মকান্ডের বাঁধা হয়ে দাড়ান বরিশালের বিশেষজ্ঞ এনেস্থেসিওলজিষ্ট ডাঃ শাওন। তিনি এনেস্থেসিওলজিষ্টদের সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি অব এনেস্থেসিয়া, ক্লিনিক্যাল কেয়ার এন্ড পেইন ফিজিসিয়ান বরিশাল শাখার নির্বাহী সদস্য। জানা গেছে, মিডটাউন হাসপাতালে রুবিনা নামের এক রোগী জরায়ু চিকিৎসার জন্য ভর্তি হন। ডাঃ আনোয়ার তাকে বুধবার অপারেশন করে জরায়ু ফেলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই মোতাবেক তিনি অপারেশন টেবিলে রোগীকে নিজেই এনেস্থেসিয়া প্রদান করেন। পরবর্তীতে পেট কেটে অপারেশন টেবিলে বিপাকে পড়েন ডাঃ আনোয়ার। নিজে শুধুমাত্র এমবিবিএস ডাক্তার হওয়ায় রোগীর জটিলতা দেখে ভড়কে যান। এক পর্যায় রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটলে তাৎক্ষনিকভাবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আনতে না পারায় অপারেশন শেষ না করেই আবার পেট সেলাই করে দেন। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ওই রোগীকে এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিষয়টি জানাজানি হলে এনেস্থেসিওলজিষ্ট সংগঠনের নেতা ডাঃ শাওন হাসপাতালে গিয়ে এর প্রতিবাদ জানান। এনেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ না হয়েও ডা. আনোয়ার কেন নিজে এনেস্থেসিয়া দিয়েছেন, এমন প্রশ্ন তোলাকে কেন্দ্র করেই ডা. শাওনের সঙ্গে তার বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন ডাঃ আনোয়ার। ক্ষিপ্ত হয়ে মারধরের চেষ্টা চালান ডাঃ শাওনকে। এক পর্যায় শাওন নিজের মোবাইল ফোন বের করে ঘটনার ভিডিও করেন। মোবাইল দেখে ডাঃ আনোয়ারের ক্ষিপ্রতা কিছুটা কমলেও ডাঃ শাওনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও হেনস্তা করেন।

ঘটনার সময় ডা. শাওনকে গালিগালাজ করার পাশাপাশি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় এবং পরে গার্ড ও স্টাফদের ডেকে তাকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়। ঘটনার ভিডিও ডাক্তারদের নিজস্ব গ্রুপ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

ডা. শাওনের দাবি, ডা. আনোয়ার কোনো নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ না হয়েও বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রোপচার করেন এবং নিজেই এনেস্থেসিয়া প্রয়োগ করেন। এতে রোগীর নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, এমন আপত্তি জানানোতেই তাকে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও জানান, যদি কোন ডাক্তারের একই সাথে সার্জন ও এনেস্থেসিয়ার উপরে ডিগ্রীও থাকে তবুও একই ব্যক্তি একইসাথে দুটি কাজ করতে পারেননা। তাতে রোগী ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ঝুকি বেশী থাকে। এ ঘটনায় বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাছে এনেস্থেসিওলজিষ্টদের সংগঠনের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

যেখানে প্রয়োজন সে অপারেশনে এনেস্থেসিয়ার ডাক্তার আলাদা না থাকলে রোগীর মৃত্যু ঝুকিও হতে পারে জানিয়ে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডাঃ মোঃ রেফায়েতুল হায়দার বলেন, এরকম ঘটনা ঘটলে বিষয়টি সঠিক হয়নি। তিনি আরও বলেন, আমরা বৃহস্পতিবার একটি অভিযোগ পেয়েছি। রোববার অন্যান্য সহ পরিচালকদের সাথে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। পাশাপাশি আর কোন ক্লিনিক এনেস্থেসিওলজিষ্ট ছাড়া যেন অপারেশন করতে না পারে সে ব্যাপারেও চিঠি দেয়াসহ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মিডটাউন হাসপাতালের এমডি ডা. আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি এমবিবিএস পাস। দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই সব অপারেশনই আমি পারি। এনেস্থেসিয়া বিষয়েও আমি অভিজ্ঞ। রোগীটির পেটের দিকে লাইপোমা আপারেশন করা হয়েছিলো। সেক্ষেত্রে লোকাল এনেস্থেসিায়া দেয়া হয়েছে। ডা. শাওন ইর্ষান্বিত হয়ে আমার সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ায়। রাগের মাথায় দু-একটা বকাঝকা করেছি। তবে তাকে আমি কোনো প্রকার হেনস্তা করিনি।

অন্যদিকে রোগীটির অন্যান্য জটিল সমস্যা থাকায় ডাঃ জহিরুল হক মানিকের তত্বাবধায়নে বরিশালের বেসরকারি এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে বলে দাবী করেন তিনি।