ভোলায় চাঁদা না দিলে মাছ বেচাকেনা বন্ধের হুমকি, প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের মাছ কেনাবেচা বন্ধ

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২০:১৫, সেপ্টেম্বর ০৪ ২০২৬ মিনিট

ভোলায় মৎস্য আড়ৎদার ও ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। চাঁদা না দিলে মাছ বেচাকেনা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকির প্রতিবাদে মাছ কেনাবেচা বন্ধ রেখে বিক্ষোভ করেছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দিতে বিএনপি নেতাকর্মী ও প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন তারা।

ভোলা সদর উপজেলা ইউনিয়নের জোড়াখাল মাছঘাটে এ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন মৎস্য আড়ৎদার ও ব্যবসায়ীরা। এ ঘটনায় ঘাটের মৎস্যজীবী ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাজাপুর ইউনিয়নের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাইটগার্ড ও সাবেক যুবদলের নামধারী ইব্রাহীম সম্প্রতি মৎস্য ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রথমে প্রতিটি গদি থেকে একজন করে জেলে দেওয়ার দাবি জানান। ব্যবসায়ীরা এতে আপত্তি জানিয়ে বলেন, তাদের আড়ৎদারদের কাছে জেলেদের দাদনের টাকা পাওনা রয়েছে। ওই টাকা পরিশোধের পর জেলেদের অন্য কারও কাছে মাছ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, তাদের কথায় রাজি না হয়ে ইব্রাহীম প্রত্যেক ব্যবসায়ীর কাছে ৫ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করেন। এতে ব্যবসায়ীরা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে একপর্যায়ে ইব্রাহীম তার লোকজন নিয়ে রাতে ঘাটে এসে কয়েকজন আড়ৎদারের স্টিল, লোহার ও কাঠের মাছ রাখার বাক্স নদীতে ফেলে দেন বলে অভিযোগ করেন তারা। এতে প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।

রাজাপুর সুইজগেট মৎস্য আড়ৎদার মাসুদ মেম্বার বলেন, জোড়খাল ঘাটে ১৬টি বাক্স রয়েছে। তারা সবাই সরকারকে রাজস্ব দিয়ে এবং ইউনিয়ন পরিষদ থেকে লাইসেন্স নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসছেন। ঘাটে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে কখনো কে কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, তা বিবেচনা করা হয়নি।

তিনি বলেন,আমরা জেলেদের দাদন দিয়ে ব্যবসা করি। কারও এক কোটি টাকা, আবার কারও ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত জেলেদের কাছে দাদন দেওয়া আছে। জেলেদের কাছ থেকে পাওয়া মাছ বিক্রি করেই আমাদের ব্যবসা চলে। কোনো সময় কাউকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে হয়নি। কিন্তু হঠাৎ করে ইব্রাহীম ব্যবসা করতে হলে টাকা দিতে হবে বলে হুমকি দিচ্ছেন। এমনকি ব্যবসায়ীদের আতঙ্কিত করতে মাছ রাখার বাক্স নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

অন্য ব্যবসায়ীরা জানান, মেঘনা নদীর তীরে যারা দীর্ঘদিন ধরে মৎস্য ব্যবসা করছেন, তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব জেলে রয়েছে এবং এসব জেলেকে তারা দাদন দিয়েছেন। দাদনের টাকা পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত জেলেদের কাছ থেকে অন্যত্র মাছ কেনার সুযোগ নেই। ফলে অন্য কাউকে জেলে দিলে দীর্ঘদিনের দাদনের টাকা অনাদায়ী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ব্যবসায়ী মিজান সর্দার বলেন, আমরা ব্যবসা করে খাই। এখানে কোনো অবৈধ কাজ হয় না। আমরা কাউকে চাঁদা দিতে পারব না। প্রশাসনের কাছে আমাদের ব্যবসার নিরাপত্তা চাই।

তিনি আরও বলেন,এখানে যারা ব্যবসা করেন, তাদের অধিকাংশই খুব সাধারণ মানুষ। পরিশ্রম করে যা আয় করেন, তা দিয়েই সংসার চালান। জেলেদের দাদন দিয়ে মাছ ধরে আনেন এবং সেই মাছ বিক্রি করে জেলে ও ব্যবসায়ী দুই পক্ষের সংসার চলে। নতুন করে ব্যবসা দাঁড় করাতে গিয়ে লোকসান দিয়ে কারও ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ব্যবসার নামে আমরা কাউকে চাঁদা দিতে পারব না। এ বিষয়ে বিএনপি নেতৃবৃন্দ ও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছি।

তবে ব্যবসায়ীদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ইব্রাহীম। তিনি বলেন, মাসুদ মেম্বার আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছেন। ঘাটের মাছের বাক্স কে বা কারা নদীতে ফেলে দিয়েছে, তার সঙ্গে আমি জড়িত নই। মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আমাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে।

তিনি আরও দাবি করেন, ২০১২ সালে মাসুদ মেম্বার তার সারের দোকান থেকে ৮ হাজার ২০০ টাকার কীটনাশক ও সার নিয়ে টাকা পরিশোধ করেননি। এছাড়া একটি মসজিদের মাহফিলের ৩২ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগও করেন তিনি। তার পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করেই তাকে চাঁদাবাজ হিসেবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে বলে দাবি ইব্রাহীমের।

এ বিষয়ে ইলিশা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বশীর আহমেদ বলেন, রাজাপুরের জোড়খাল মৎস্য আড়ৎদারদের মাছ রাখার বাক্স নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত ভোলা জেলায় প্রায় ১২৫টি মৎস্যঘাট রয়েছে। এসব ঘাটে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয়ে থাকে। ফলে মৎস্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।