সহজিয়ার সুরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যরকম সন্ধ্যা

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ১৯:৫৮, সেপ্টেম্বর ০৪ ২০২৬ মিনিট

বৃহস্পতিবারের (০৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যাটা অন্যরকম ছিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যাম্পাসজুড়ে তখন তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, বন্ধুদের আড্ডা আর অপেক্ষা, কখন মঞ্চে উঠবে প্রিয় ব্যান্ড সহজিয়া। গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল আয়োজিত ‘পলাশ কুঁড়ি অভিষেক ৩.০’ অনুষ্ঠানের সেই সন্ধ্যা শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় গান, নাচ, উচ্ছ্বাস আর মানবিকতার এক অনন্য মিলনমেলায়। মঞ্চে সহজিয়া উঠতেই যেন বদলে যায় পুরো পরিবেশ। একে একে পরিবেশিত হতে থাকে তাদের জনপ্রিয় গান। আর প্রিয় গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে মেলাতে শ্রোতারা কখন যে দর্শক থেকে অনুষ্ঠানেরই অংশ হয়ে উঠেছেন, তা বোঝার উপায় ছিল না। বাংলাদেশের জনপ্রিয় লোক-রক ব্যান্ডের মূল প্রতিষ্ঠাতা, গীতিকার ও ভোকালিস্ট রাজিব আহমেদ রাজুর গান শুরু হতেই উচ্ছ্বাস যেন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে। রাজু ভাইয়ের কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মেলায় শত শত শিক্ষার্থী। কেউ গাইছেন, কেউ নাচছেন, কেউবা মোবাইলের ক্যামেরায় ধরে রাখছেন স্মরণীয় মুহূর্তগুলো। মনে হচ্ছিল, গানটি শুধু মঞ্চে নয়, সেদিন গাওয়া হচ্ছিল পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদয় থেকে। এরপর আসে ‘বোকা পাখি’, ‘ছোট্ট পাখি’ ও ‘অপেক্ষা’সহ আরও কয়েকটি জনপ্রিয় গান। প্রতিটি গানের সঙ্গে শ্রোতাদের উচ্ছ্বাস যেন আরও বাড়তে থাকে। পরিচিত সুর আর কথাগুলো ক্যাম্পাসের বাতাসে মিশে তৈরি করে এক আবেগঘন পরিবেশ। তবে সন্ধ্যাটি শুধু আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সহজিয়ার পক্ষ থেকে একটি গান উৎসর্গ করা হয় ফিলিস্তিনের শিশুদের প্রতি। যুদ্ধের নির্মমতায় যেসব শিশু হারিয়েছে শৈশব, নিরাপত্তা আর স্বাভাবিক জীবনের অধিকার, তাদের স্মরণে গাওয়া সেই গান আনন্দের সন্ধ্যায় এনে দেয় এক গভীর মানবিক অনুভূতি। একদিকে হাজারো তরুণের কণ্ঠে গান, অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের প্রতি সংহতির বার্তা, সন্ধ্যাটি তাই হয়ে ওঠে একই সঙ্গে আনন্দের এবং অনুভূতির। সংগীতের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো এখানেই, এটি মানুষকে একত্র করে। ভাষা, মত কিংবা পরিচয়ের সীমারেখা পেরিয়ে কয়েকটি সুর মানুষকে একই অনুভূতিতে যুক্ত করতে পারে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সন্ধ্যায় সহজিয়া ঠিক সেটিই যেন করে দেখাল। রাত বাড়ল। মঞ্চের আলো নিভল। ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান শেষ হলো। কিন্তু সহজিয়ার সুর তখনও যেন ভেসে বেড়াচ্ছিল ক্যাম্পাসের পথে-প্রান্তরে। শিক্ষার্থীদের মুখে হাসি, মনে গানের রেশ আর স্মৃতিতে জমে রইল একটি অসাধারণ সন্ধ্যা। ‘পলাশ কুঁড়ি অভিষেক ৩.০’, শুধু একটি আয়োজন নয়; বরং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তারুণ্য, সংগীত, বন্ধুত্ব, সংস্কৃতি ও মানবিকতার এক স্মরণীয় সন্ধ্যার নাম। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত নানা পরিবেশনা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক আবহে মুখর হয়ে ওঠে কীর্তনখোলা নদীর তীরের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর আগে বিকেল নাগাদ শুরু হয় গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আয়োজনে ‘পলাশ কুঁড়ি অভিষেক ৩.০’। নবীন শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুইজ প্রতিযোগিতা ও উদ্বোধনী গণসংগীত ‘মুক্তিরও মন্দিরও সোপানতলে’র মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। এরপর হাসিবুর রহমানের কণ্ঠে বিদ্রোহী কবিতা এবং ফারিয়া রহমানের আবৃত্তিতে ‘সৃষ্টির মানুষ’ পরিবেশিত হয়। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজনের উদ্বোধন করেন গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক আহ্বায়ক সুজয় শুভ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মুখভাগে যখন বিকেলের আয়োজন জমে উঠেছে, তখনই হঠাৎ বৃষ্টি এসে ছন্দপতন ঘটায়। তবে বৃষ্টি দমাতে পারেনি তরুণদের। উপায়ান্ত না দেখে আয়োজক ও শিক্ষার্থীরা দ্রুত মঞ্চ সরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারের মেঝেতে নতুন করে মঞ্চ তৈরির উদ্যোগ নেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বদলে যায় আয়োজনের স্থান। মঞ্চ সরানোর সেই কাজে শুধু আয়োজক বা শিক্ষার্থীরাই নন, সাংবাদিক মানজুর আল মতিনকেও হাত লাগাতে দেখা যায়। তারুণ্যের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ পুরো আয়োজনকে ভিন্ন এক মাত্রা দেয়। নতুন মঞ্চে আয়োজন শুরুর পর সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন লেখক ও গবেষক মাহাতাব উদ্দিন, বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার সরকার এবং আইনজীবী ও সাংবাদিক মানজুর আল মতিন। তাদের আলোচনায় উঠে আসে তরুণ প্রজন্ম, সমাজ, সংস্কৃতি ও সমকালীন নানা প্রসঙ্গ। আলোচনা শেষে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পর্ব। কল্পনা চাকমার কণ্ঠে কোরাস গান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোরাস আবৃত্তি আসর দর্শকদের মধ্যে তৈরি করে অন্যরকম আবহ। শাকিরা বিনতে সাঈদের পরিবেশনা ‘ও যে মানে না মানা’ও ছিল প্রশংসনীয়। তবে সন্ধ্যার অন্যতম প্রশান্তিময় মুহূর্ত হয়ে ওঠে হনুফা আহমেদের কণ্ঠে ‘জাত গেল বলে’ গানটি। তার পরিবেশনায় উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয় গভীর মনোযোগ ও মুগ্ধতা। এরপর একে একে মঞ্চে আসেন অরূপ শিকদার, পূর্ণা বচনিকা, অর্জিত ও প্রিয়রত্না। তাদের গান, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশনা পুরো আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। জারিনের কণ্ঠে ‘প্রিয় যাই যাই বলো না’ এবং শ্রেয়ার রবীন্দ্রসংগীতেও মুগ্ধ হন দর্শকরা। গালিবের ‘হার কালা করলা রে...’ গানটিও ছিল বেশ উপভোগ্য। শাওনও নিজের পরিবেশনায় দর্শকদের জন্য উপহার দেন একটি চমৎকার গান। আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ ছিল আদিবাসী শিক্ষার্থীদের নৃত্য পরিবেশনা। তাদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের ছন্দে কীর্তনখোলা নদীতীরের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ যেন আরও বর্ণিল হয়ে ওঠে। বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এই উপস্থাপন পুরো আয়োজনের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দেয়। সবশেষে মঞ্চ মাতাতে আসে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যান্ড ‘রিটেক’। তাদের পরিবেশনার পর অপেক্ষা ছিল ‘সহজিয়া’র জন্য। জনপ্রিয় এই ব্যান্ড মঞ্চে আসার আগেই রিটেকের পরিবেশনায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। পরে সহজিয়ার সুরে রাত আরও গভীর হয়, আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে পুরো প্রাঙ্গণে। পুরো আয়োজনের সঞ্চালনায় ছিলেন গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের উদীয়মান নেতৃত্ব ভূমিকা সরকার। তার সাবলীল উপস্থাপনায় বিকেল থেকে রাতের পুরো অনুষ্ঠান এগিয়ে যায় প্রাণবন্ত গতিতে। বৃষ্টির বাধা, মঞ্চ বদলের তাড়াহুড়ো, স্বেচ্ছাশ্রম, আলোচনা, আবৃত্তি, গান, নৃত্য আর ব্যান্ডের সুর, সবকিছু মিলিয়ে ‘পলাশ কুঁড়ি অভিষেক ৩.০’ শেষ পর্যন্ত কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের নিজেদের মতো করে সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও সৃজনশীলতাকে উদ্‌যাপনের এক অনন্য আয়োজন। কীর্তনখোলার বাতাসে যখন শেষ রাতের সুর মিলিয়ে যাচ্ছিল, তখনও যেন থেকে যাচ্ছিল একটি বার্তা—তারুণ্য শুধু উচ্ছ্বাসের নাম নয়; প্রয়োজনের মুহূর্তে একসঙ্গে দাঁড়ানোর, সংস্কৃতিকে ধারণ করার এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখারও নাম তারুণ্য।