বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে জ্বালানি সংকটে জেনারেটর অচল, ব্যাহত অস্ত্রোপচার
নিজস্ব প্রতিবেদক : জেনারেটর আছে কিন্তু সেটি চালানোর মতো পর্যাপ্ত ডিজেল নেই। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে কার্যত অচল হয়ে পড়ে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের বড় একটি অংশ। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন ভর্তি রোগীরা। এমনকি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জরুরি অস্ত্রোপচারও ব্যাহত হচ্ছে।
৫৮ বছর ধরে হাসপাতালটির জেনারেটরের জ্বালানি বরাদ্দের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।
১৯৬৮ সালে ২৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা হাসপাতালটি পরবর্তীতে সম্প্রসারণের মাধ্যমে এক হাজার শয্যায় উন্নীত হয়। তবে শয্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে জনবল বাড়েনি।
চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পদ শূন্য রয়েছে। পুরোনো অবকাঠামোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটও দিন দিন প্রকট হচ্ছে।
হাসপাতালের পুরোনো ভবনে দুটি ফিডারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলেও নতুন ভবনে সমস্যা তীব্র। একটি মাত্র বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে সেখানে দিনে-রাতে মিলিয়ে সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না।
বিদ্যুৎ না থাকলে বন্ধ হয়ে যায় লিফট। অন্ধকারে পড়ে থাকে ওয়ার্ড, বন্ধ থাকে বৈদ্যুতিক পাখা। এতে রোগীদের পাশাপাশি স্বজনদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন চিকিৎসক জানান, প্রতিদিন গড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ রোগী নতুন ভবনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি থাকেন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অসুস্থ রোগীদের কষ্ট বেড়ে যায় বহুগুণ।
বরগুনার বামনা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা বৃদ্ধ মেনহাজ ফকির বলেন, আশপাশে ভবন থাকায় ওয়ার্ডে বাতাস চলাচল কম। বিদ্যুৎ না থাকলে প্রচণ্ড গরমে রোগীদের অসহ্য কষ্ট হয়।
পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি থেকে মায়ের চিকিৎসার জন্য আসা শাহানাজ বেগম বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফট বন্ধ হয়ে যায়। এতে রোগীকে এক তলা থেকে অন্য তলায় নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
হাসপাতালের মূল ভবনেই আইসিইউ, সিসিইউ এবং অপারেশন থিয়েটারগুলো অবস্থিত। কর্মকর্তারা জানান, তিন হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন হাসপাতালে, যার মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ রোগী মূল ভবনে চিকিৎসাধীন থাকেন।
স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫টি অস্ত্রোপচার হলেও লোডশেডিংয়ের কারণে তা কমে ১০ থেকে ১২টিতে নেমে এসেছে। ইউরোলজি বিভাগের অস্ত্রোপচার সপ্তাহে এক দিন নির্ধারিত থাকায় বিদ্যুৎ সংকটে সেটি বাতিল হলে রোগীকে পরবর্তী সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফটও বন্ধ থাকে। ফলে পাঁচতলা পর্যন্ত রোগী বহন, স্বজনদের চলাচলসহ সব কাজ সিঁড়ি দিয়েই করতে হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, জেনারেটরের মাধ্যমে আইসিইউ, সিসিইউ ও অপারেশন থিয়েটারের প্রয়োজনীয় আলো চালু রাখা গেলেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হয় না।
ফলে প্রচণ্ড গরমের মধ্যেই চিকিৎসকদের অস্ত্রোপচারের কাজ করতে হচ্ছে। হাসপাতালের পুরোনো ও নতুন ভবনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য চারটি জেনারেটর রয়েছে।
কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো চালানো যাচ্ছে না। হাসপাতাল ক্যাম্পাসের বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী এসএম মাহবুব হোসাইন বলেন, নতুন ভবনের জন্য ২৫০ কেভিএ ক্ষমতার একটি নতুন জেনারেটর রয়েছে। তবে তেলের অভাবে সেটি সচল রাখা যাচ্ছে না। মূল ভবনে ২৫০, ১২৫ ও ৬০ কেভিএ ক্ষমতার আরও তিনটি জেনারেটর রয়েছে।
সরবরাহ করা তেল দিয়ে একসঙ্গে সবগুলো চালানো সম্ভব হয় না। গণপূর্ত অধিদপ্তর বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম জানান, একটি জেনারেটর চালাতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১১০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়।
বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ও সংরক্ষণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসা শেবাচিম হাসপাতাল। এত বছরেও জেনারেটরের জ্বালানি সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়া দুঃখজনক।
শেবাচিম হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, নতুন ভবনে আরেকটি বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের পাশাপাশি জেনারেটরের জন্য তেল বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। দ্রুত সংকটের সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
