পটুয়াখালীতে আইফোন কিনতে লাখ টাকায় নিজের সন্তান বিক্রি করলেন বাবা : অতঃপর

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২১:৪৬, আগস্ট ৩১ ২০২৬ মিনিট

যে বয়সে বাবার আঙুল ধরে হাঁটতে শেখার কথা, মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমানোর কথা, সে বয়সেই দেড় বছরের শিশু মুসার জীবনে নেমে এলো নির্মম এক বাস্তবতা। নিজের বাবাই তাকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছেন—এমন অভিযোগে এখন বাবার ঠাঁই হয়েছে পুলিশের হাতে। আর যে শিশুটিকে নিয়ে সকালে ‘বাজারে যাওয়ার’ কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন বাবা, সেই মুসাকে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করতে হয়েছে দুর্গম চরকাজল দ্বীপাঞ্চল থেকে।

পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের মাছুয়াখালী গ্রামের মুন্সিবাড়ি এলাকায় ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে শোক ও ক্ষোভের ছায়া। উদ্ধার করা হয়েছে দেড় বছরের শিশু জাহিদুল ইসলাম মুসাকে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে তার বাবা মো. মারুফকে (২২)।

পরিবারের অভিযোগ, শিশুটিকে অন্যের কাছে তুলে দিয়ে পাওয়া এক লাখ টাকা থেকে ৫২ হাজার টাকা খরচ করে একটি পুরোনো আইফোন কেনেন মারুফ। এরপর চলে যান ঢাকায়। অন্যদিকে নাতির কোনো খোঁজ না পেয়ে পাগলপ্রায় হয়ে পড়েন বৃদ্ধ দাদা-দাদি।

শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল মুসার পরিবারের। মারুফ তার মা মাহফুজা বেগমকে বলেন, মুসাকে জামাকাপড় পরিয়ে দিতে। ছেলেকে নিয়ে বাজারে যাবেন—এমনটাই জানিয়েছিলেন তিনি। দাদি স্নেহভরে নাতিকে জামাকাপড় পরিয়ে দেন। কিন্তু তিনি কি জানতেন, এটাই হতে যাচ্ছে নাতির সঙ্গে তার সেই মুহূর্তের শেষ দেখা?

মুসাকে কোলে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন মারুফ। সময় গড়াতে থাকে। কিন্তু বাবা-ছেলে আর ফেরেন না। প্রথমে অপেক্ষা, তারপর উৎকণ্ঠা, এরপর শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। স্বজনরা ছুটতে থাকেন এদিক-ওদিক। বাড়ির উঠানে, বাজারে, পরিচিতদের কাছে—কোথাও নেই মুসা।

একপর্যায়ে মোবাইল ফোনে মারুফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন এমন এক খবর, যা শুনে যেন তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। মারুফ জানান, তিনি তার দেড় বছরের সন্তানকে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে ইমরান হোসেন নামে এক ব্যক্তির কাছে দিয়ে দিয়েছেন। বিনিময়ে নিয়েছেন এক লাখ টাকা।

নাতিকে হারানোর কথা শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন দাদা-দাদি। যে শিশুটিকে কিছুক্ষণ আগেও আদর করে সাজিয়ে দিয়েছিলেন দাদি, সেই শিশুই এখন কোথায়—কোনো উত্তর নেই। নাতিকে ফিরে পেতে তারা ছুটে যান পুলিশের কাছে।

পরে মারুফকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেয় পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে শিশুটিকে ইমরানের কাছে দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন বলে পরিবার সূত্রে জানা যায়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শিশুটিকে উদ্ধারে অভিযান শুরু করে দশমিনা থানা পুলিশ।

রবিবার (৩০ আগস্ট) রাত প্রায় ১০টা। দুর্গম চরকাজল দ্বীপাঞ্চলে পৌঁছে পুলিশ। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় ছোট্ট মুসাকে। তাকে নিয়ে পুলিশ থানায় ফিরে আসে।

নাতিকে চোখের সামনে ফিরে পেয়ে তখন আর কান্না থামাতে পারেননি দাদা-দাদি। কয়েকদিনের উৎকণ্ঠা, ভয় আর অনিশ্চয়তার পর প্রিয় নাতিকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। মুসা হয়তো জানে না, তাকে ঘিরে তার আপনজনদের বুকের ভেতর কতটা ঝড় বয়ে গেছে। সে জানে না, তার ফিরে আসার অপেক্ষায় কতগুলো চোখ পথ চেয়ে ছিল।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় চার বছর আগে সাভারের বৃষ্টি নামের এক তরুণীর সঙ্গে মারুফের পরিচয় হয়। পরে তারা বিয়ে করেন। তাদের সংসারে জন্ম নেয় মুসা। কিন্তু সেই সংসারও বেশিদিন টেকেনি। প্রায় এক মাস আগে পারিবারিক বিরোধের জেরে বৃষ্টি বাবার বাড়িতে চলে যান। এরপর মারুফও ঢাকায় চলে যান। শিশুটিকে রেখে যান নিজের বাবা-মায়ের কাছে।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সন্ধ্যার আগে বাড়িতে ফেরেন মারুফ। পরদিন সকালে মুসাকে নিয়ে বের হন। পরিবারের অভিযোগ, এরপরই শিশুটিকে অন্যের কাছে তুলে দেন তিনি।

এদিকে পাওয়া গেছে শিশুটিকে হস্তান্তরের একটি লিখিত চুক্তিপত্র। সেখানে মারুফ ও ইমরান হোসেনকে প্রথম ও দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তিতে শিশুটির নাম জাহিদুল ইসলাম মুসা এবং জন্মতারিখ ১১ মে ২০২৫ উল্লেখ করা হয়েছে। স্ত্রী চলে যাওয়ায় শিশুটিকে লালন-পালন ও সেবা-যত্ন করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে দাবি করে মারুফ শিশুটিকে ইমরানের কাছে দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

চুক্তিপত্রে এক লাখ টাকার বিনিময়ে শিশুটিকে ‘দত্তক’ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে মারুফ কিংবা তার উত্তরাধিকারীরা শিশুটির বিষয়ে কোনো দাবি করতে পারবেন না—এমন কথাও উল্লেখ রয়েছে।

তবে একটি দেড় বছরের শিশুকে অর্থের বিনিময়ে এভাবে অন্যের কাছে হস্তান্তরের আইনগত বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। শিশুটির সর্বোত্তম স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এ ঘটনায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

শিশুটিকে নিজের কাছে রাখা ইমরান হোসেন দাবি করেন, মারুফ আগে থেকেই তার কাছে শিশুটিকে দেওয়ার কথা বলে আসছিলেন। তার শ্বশুরের পাঁচ মেয়ে থাকলেও কোনো ছেলে সন্তান নেই। পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করেই শিশুটিকে সেখানে রাখা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে পরিবারের অভিযোগ, শিশুটিকে দেওয়ার বিনিময়ে পাওয়া এক লাখ টাকা থেকে ৫২ হাজার টাকা দিয়ে পুরোনো আইফোন কিনেছেন মারুফ। পরে তিনি ঢাকায় চলে যান। এ অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই নিশ্চিত হবে।

দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, শিশুটিকে চরকাজল এলাকার যার কাছে রাখা হয়েছিল, সেখান থেকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিশুটির বাবাকে ঢাকা থেকে আনার চেষ্টা চালানো হয়েছে।

ওসি বলেন, শিশুটিকে দেওয়ার ঘটনায় টাকা-পয়সা লেনদেন হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়া হবে। শিশুটির বাবা-মায়ের মধ্যেও ভালো সম্পর্ক ছিল না। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে।

ছোট্ট মুসা এখন ফিরে এসেছে তার দাদা-দাদির কাছে। কিন্তু তার দেড় বছরের জীবনে ঘটে যাওয়া এই কয়েকটি দিন হয়তো পরিবারের মনে দীর্ঘদিনের ক্ষত হয়ে থাকবে। যে শিশুর কাছে এক লাখ টাকা, একটি আইফোন কিংবা কোনো চুক্তিপত্রের অর্থই নেই, সেই শিশুকেই ঘিরে বড়দের সিদ্ধান্তে তৈরি হয়েছে এক নির্মম বাস্তবতা।

মুসা হয়তো এখনো বোঝে না—কেন তাকে বাবার হাত থেকে অন্যের হাতে যেতে হয়েছিল, কেন তাকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে পুলিশকে ছুটতে হয়েছিল দুর্গম চরকাজলে। সে শুধু জানে, আবার ফিরে এসেছে আপনজনের কাছে। দাদা-দাদির কোলে ফিরে পাওয়া সেই ছোট্ট শিশুটিই যেন প্রশ্ন রেখে গেছে—একটি শিশুর ভালোবাসা, নিরাপত্তা আর ভবিষ্যতের মূল্য কি কখনো এক লাখ টাকা কিংবা একটি আইফোন হতে পারে?