বরগুনায় দাপ্তরিক জটিলতায় ৪৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক এখন কাঁচা, দুর্ভোগ চরমে
দাপ্তরিক জটিলতায় বরগুনায় প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক আবারও কাঁচা সড়কে পরিণত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব বেড়িবাঁধ উঁচু করার সময় এসব সড়কের পাকা অংশ নষ্ট হলেও তা পুনরায় সংস্কার করেনি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ফলে বর্ষায় সড়কগুলো কর্দমাক্ত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় গর্ত ও জলাবদ্ধতা। এতে বন্ধ হয়ে গেছে যানবাহন চলাচল। বিকল্প সড়ক না থাকায় গত দুই বছর ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বেড়িবাঁধ এলাকার লক্ষাধিক মানুষ।
জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় মানুষকে রক্ষায় বরগুনায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৮০৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এ সব এলাকার বাসিন্দাদের যোগাযোগের জন্য বিকল্প সড়ক না থাকায়, অধিকাংশ বেড়িবাঁধই যোগাযোগের মাধ্যম সড়ক হিসেবেও ব্যবার করা হয়। এ ছাড়াও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী অনেক বাঁধই কার্পেটিং করছে এলজিইডি। সম্প্রতি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় জেলার সদর উপজেলায় ২০ কিলোমিটার, তালতলী উপজেলায় ৩ কিলোমিটার এবং পাথরঘাটা উপজেলায় ২২ কিলোমিটার মোট ৪৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ উঁচু করা হয় চায়নায় এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এ সময় বাঁধের ওপর থাকা পাকা সড়কের কার্পেটিং তুলে বাঁধ উঁচু করা হয়। এরপর দাপ্তরিক জটিলতায় সড়কগুলো আর পাকা করা হয়নি।
সরেজমিনে বরগুনা সদর উপজেলার বরগুনা-গুলবুনিয়া-পুরাকাটা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় আট বছর আগে এলজিইডির উদ্যোগে সড়কটি পাকা করা হয়। তবে দুই বছর আগে সড়কের কার্পেটিং তুলে বেড়িবাঁধ উঁচু করায় সড়কটি আবার কাঁচা হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টি হলেই সড়কটি কর্দমাক্ত হয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত, সেগুলোতে জমে আছে পানি। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শুধু এই সড়ক নয়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের সড়কের একই অবস্থা। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরা। পাশাপাশি উৎপাদিত ফসল পরিবহনেও সমস্যায় পড়ছেন কৃষকেরা। দ্রুত এসব সড়ক পুনরায় পাকা করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী স্থানীয়রা।
একই সড়ক দুই দপ্তরের আওতায় থাকায় পাকা হচ্ছে না জানিয়ে গুলবুনিয়া এলাকার বাসিন্দা নূর ইসলাম মুসল্লী বলেন, আমাদের এই সড়ক পানি উন্নয়ন বোর্ড ও এলজিইডির আওতায় থাকায় কোনো কাজই হচ্ছে না। দুই বছর ধরে রাস্তাটি কাঁচা পড়ে আছে। গ্রামের মানুষ ঠিকভাবে যাতায়াত করতে পারছে না। বর্ষায় ফসল পরিবহনেও আমাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
পুরাকাটা এলাকার বাসিন্দা মো. আরিফ বলেন, নদীর পাশে বাড়ি হওয়ায় আমরা জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে ছিলাম। এরপর পানি উন্নয়ন বোর্ড আমাদের রাস্তাটি উঁচু করেছে। চার বছর আগে আমাদের রাস্তার কাজ শুরু হয়। কিন্তু উঁচু করার পর আর পাকা হয়নি। এই রাস্তায় আমাদেরই কষ্ট করে চলাচল করতে হয় এর মধ্যে সমস্যা হয় শিশু ও বয়স্কদের। দ্রুত রাস্তাটি আবার পাকা করার দাবি জানাই।
মামুন নামের এক রিকশাচালক বলেন, সড়ক কাচা হবার কারণে খুব ভোগান্তিতে আছি। বাড়ি থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পথ রিকশা ঠেলে তারপর পাকা সড়কে উঠতে হয়। অনেক সময় রাস্তায় কাদা বেশি হলে ঠেলেও নেওয়া যায় না। এতে আমি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেহেতু বেড়িবাঁধ উঁচু করতে হয় তাই ভবিষ্যতে বেড়িবাঁধ পাকা না করে বিকল্প সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে জানান বরগুনার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হান্নান প্রধান।
তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে বরগুনায় ৮০৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এ বেড়িবাঁধগুলো মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন সময়ে এলজিইডির সঙ্গে সমঝোতায় অনেক বাঁধ কার্পেটিং করা হয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধগুলো উঁচু করার প্রয়োজন হয়। আর এ কারণেই প্রয়োজনীয় বাঁধ উঁচু করতে কার্পেটিং খুলে উঁচু করা হয়েছে। তবে যদি বাঁধের বাইরে যোগাযোগের জন্য আলাদা সড়ক নির্মাণ করা যায়, তাহলে আর এ সমস্যার সৃষ্টি হবে না। তবে পানির উচ্চতার লেভেল বিবেচনায় এবং জনগণের চাহিদা অনুযায়ী কোথাও যাদি বাঁধ কার্পেটিং করার প্রয়োজন হয় তা পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়।
কাঁচা সড়ক এখনও পাকা সড়কের তালিকায় রয়েছে জানিয়ে বরগুনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌচশলী মো. মেহেদী হাসান খান বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের ওপরে আমাদের কয়েকটি সড়ক আছে। বেড়িবাঁধ উঁচু করার কারণে বর্তমানে পাকা সেই সড়কগুলো কাঁচা হয়েছে। আমাদের একটি রোড ডাটাবেইজ আছে। সেখানে ওই সড়কগুলো এখন পর্যন্ত পাকা দেখানো রয়েছে। ডাটাবেইজে ওই সড়কগুলোকে কাঁচা দেখানোর জন্য কাজ চলছে। পাশাপাশি সদরদপ্তরে ছবিসহ তথ্য পাঠানো হয়েছে। এ কাজ সম্পন্ন হলেই সড়কগুলো পুনরায় পাকা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
