১৮০ দিনের মূল্যায়নের মুখে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা, রদবদল নিয়ে জল্পনা

দেশ জনপদ ডেস্ক | ২১:৫৭, আগস্ট ১৭ ২০২৬ মিনিট

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদল ঘিরে সরকার ও রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা গুঞ্জন। ছয় মাস বা ১৮০ দিন পূর্ণ করা এ মন্ত্রিসভায় কি হাত দিতে চলেছেন সরকারপ্রধান? তা নিয়ে অবশ্য এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই। তবে এখন পর্যন্ত সরকারের কাজের মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের নৈপুণ্য, সীমাবদ্ধতা ও আগামী দিনের কৌশল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মন্ত্রিসভার সদস্যদের কাজকর্মের যে হিসাব-নিকাশ চলছে, তার জেরে অন্তত দুটি মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে— এমন আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকজন প্রতিমন্ত্রীকে প্রমোশন দিয়ে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া এবং একেবারে নতুন কয়েকটি মুখকে সরকারে আনার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

তবে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আরেকটি সূত্রের বক্তব্য, ছয় মাস হয়েছে বলেই যে কাউকে সরাতে হবে, এমন কোনো সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর নেই। বরং কোন মন্ত্রণালয়ের কাজ কোথায় আটকে রয়েছে, কোথায় গতি কম, কোথায় দায়িত্বের পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন, সেই হিসেবেই সিদ্ধান্ত হতে পারে।

সোমবার (১৭ আগস্ট) তারেক রহমান সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে। এই সময়সীমা ঘিরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরকারের প্রথম ১৮০ দিন বা ছয় মাসের কাজের মূল্যায়ন করার কথা প্রকাশ্যে এসেছে।

সম্প্রতি সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অর্জন, কর্মকাণ্ড ও সীমাবদ্ধতা খতিয়ে দেখছে। পর্যালোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী জাতির সামনে সরকারের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবেন।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই মূল্যায়ন শেষ হওয়ার পরই মন্ত্রিসভা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের ছবিটা আরও স্পষ্ট হতে পারে।

নজরে সাত-আট মন্ত্রণালয় সরকারের এক দায়িত্বশীল মন্ত্রীর কথায়, সাত-আটটি মন্ত্রণালয়ের কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। তার দাবি, এর কয়েকটিতে রদবদলের সম্ভাবনা রয়েছে। একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীদের কারও কারও ভার কমানো হতে পারে। সেই জায়গায় নতুন কাউকে আনার কথাও ভাবা হচ্ছে।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রী কয়েকজন মন্ত্রীকে ডেকে কাজের অগ্রগতি নিয়ে কথা বলেছেন বলেও একটি সূত্রের দাবি। কারও কারও জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, ছয় মাসের মাথায় যে মূল্যায়ন হচ্ছে, তা নিছক আনুষ্ঠানিক নয়, মন্ত্রিসভার ভবিষ্যৎ বিন্যাসের সঙ্গে এর যোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দীপেন দেওয়ানের পর কি আরও? তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় এখন পর্যন্ত বড় ধরনের রদবদল হয়নি। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে গত ১ জুন পদত্যাগ করেন। তার জায়গায় প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।

এখন প্রশ্ন উঠেছে— আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে কি মুখ বদল হতে পারে? সরকারের অন্দরমহলের খবর, সম্ভাবনাটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে মন্ত্রিসভায় ২৪ জন মন্ত্রী, ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী এবং মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় ১০ জন উপদেষ্টা রয়েছেন। তাদের মধ্যে কারও দপ্তর বদল, কারও দায়িত্ব কমানো কিংবা কাউকে নতুন দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

প্রতিমন্ত্রীদের মধ্য থেকে প্রমোশন? সম্ভাব্য রদবদলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হতে পারে কয়েকজন প্রতিমন্ত্রীর পূর্ণমন্ত্রী হয়ে ওঠা। সরকারের একটি সূত্রের বক্তব্য, ২৩ জন প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে কয়েকজনকে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তবে সেই তালিকায় কারা রয়েছেন, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা মুখ খুলতে নারাজ।

সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেন, গণমাধ্যমে যা আলোচনা হচ্ছে— কে পূর্ণমন্ত্রী হবেন, কে আসবেন, কে যাবেন— এসব নিয়ে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়।

বিএনপির অন্দরেও চলছে হিসাব নতুন মুখের সম্ভাব্য তালিকায় বিএনপির বেশ কয়েকজন পরিচিত নেতার নাম ঘুরছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও রুহুল কবির রিজভী, ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবদিন ফারুক, শামসুজ্জামান দুদু ও ড. আসাদুজ্জামান রিপন, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের নাম নিয়ে দলীয় মহলে আলোচনা রয়েছে।

এছাড়া শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়কারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, বিএনপির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম, লন্ডন বিএনপির নেতা মাহিদুর রহমান ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবিবার নামও আলোচনায় আছে।

তবে এই তালিকা যে চূড়ান্ত নয়, তা স্পষ্ট। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ওপরই।

শরিকদের জন্যও কি খুলবে দরজা? মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ এলে তা শুধু বিএনপির মধ্য থেকেই নেওয়া হবে, না কি যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদেরও জায়গা দেওয়া হবে— সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। এ ক্ষেত্রে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থের নাম নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা রয়েছে।

এরই মধ্যে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজ প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। সেই সঙ্গে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এবং গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি একই মর্যাদায় মন্ত্রিসভায় আছেন। ফলে শরিকদের আরও কাউকে সেখানে আনার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এ নিয়ে কথা হলে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘গসিপ শুনতেছি, ডেফিনেটলি কিছু জানি না। ব্যক্তি হিসেবে প্রত্যাশা নেই, তবে দলীয়ভাবে অবশ্যই প্রত্যাশা রয়েছে।’

অন্যদিকে, সরকারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে মুশফিকুল ফজল আনসারীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।’

পার্থকে ঘিরে আলোচনা বেশি মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য নতুন মুখের তালিকায় আন্দালিব রহমান পার্থের নামটিই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। বিজেপির নেতাদের একাংশের দাবি, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই তিনি মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে পারেন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এমন কোনো ঘোষণা নেই।

অন্য একটি সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ হওয়ার পর মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে আসতে পারে। অর্থাৎ ১৭ আগস্ট ছয় মাস পূর্ণ হলেই যে রদবদল হবে, এমনটা নয়।

আসল সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর হাতে সরকারের এক শীর্ষ সূত্রের বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী সবার সঙ্গে কথা বলছেন। মন্ত্রীদের কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করছেন। রদবদল হতে পারে। তবে সেটা ছয় মাসেও হতে পারে, আবার এক বছরেও হতে পারে।

তাই আপাতত প্রশ্নটি শুধু রদবদল হবে কি না তা নয়। বরং প্রশ্ন— কতটা হবে এবং কারা সেই পরিবর্তনের মুখে পড়বেন?

ছয় মাসের মাথায় তারেক রহমানের সরকার যখন প্রথম বড় মূল্যায়নের মুখোমুখি, তখন মন্ত্রিসভার অন্দরে সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি আলোচিত— নতুন সরকার কি এবার সত্যিই কয়েকজন নতুন মুখ নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করতে চলেছে?