ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে দলীয়করণ : রাজাপুরে তালিকায় ছাত্রদল, ছাত্রলীগ ও যুবদলের নেতাকর্মী

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২১:৫৬, আগস্ট ১৬ ২০২৬ মিনিট

ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬-এর তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগের কথা থাকলেও চূড়ান্ত তালিকায় স্থানীয় ছাত্রদল, যুবদল ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠজনদের নাম রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক আবেদনকারী ও স্থানীয় বাসিন্দা।

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন নিয়োগপ্রত্যাশীদের অনেকে। তবে নিয়োগ বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতারা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচন করা হয়েছে।

রাজাপুর উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ জুলাই ‘রাজাপুর উপজেলা ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬’-এর জন্য ছয়টি ইউনিয়নে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে নিয়োগের জন্য ব্যবহারিক দক্ষতা, মৌখিক পরীক্ষা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাইয়ের কথা বলা হয়। এতে সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী পদে পাঁচ শতাধিক প্রার্থী আবেদন করেন।

গত ৯ আগস্ট সন্ধ্যায় স্বেচ্ছাসেবী নির্বাচন কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরি ও সদস্য সচিব উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেলের স্বাক্ষরে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। তালিকায় ৯০ জন তথ্য সংগ্রহকারীর মধ্যে ৫১ জনকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত, পাঁচজনকে রিজার্ভ ও ৩৪ জনকে অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে। একইভাবে ১০ জন সুপারভাইজারের মধ্যে পাঁচজন প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত, একজন রিজার্ভ এবং চারজনকে অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা হয়েছে।

রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ আবেদনকারী ও স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, নির্বাচিতদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মী ও তাঁদের ঘনিষ্ঠজন রয়েছেন। তাঁদের দাবি, যোগ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সুপারিশও নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজাপুর সদর ইউনিয়নে তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নির্বাচিতদের মধ্যে সদর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. সাকিব আল হাসান শান্ত এবং সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি পদপ্রার্থী মো. তরিকুল ইসলামের নাম রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই ইউনিয়নে সুপারভাইজার হিসেবে নির্বাচিত মো. নূর হোসেন হৃদয় ওরফে ‘চশমা সুমন’ স্থানীয় যুবদলের সভাপতি পদপ্রার্থী এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামালের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত—এমন দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

এ ছাড়া শুক্তাগড় ইউনিয়নে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. শাকিল এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাসিম উদ্দিন আকনের ভাতিজা মো. হিমেল আকনের নাম নির্বাচিতদের তালিকায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

গালুয়া ইউনিয়নে তথ্য সংগ্রহকারী পদে মুহাম্মদ মাহফুজ আহমেদের আবেদনে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির সিল ও স্বাক্ষরসহ লিখিত সুপারিশ থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে। একইভাবে শুক্তাগড় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা শারমিন আক্তারের আবেদনে স্থানীয় বিএনপি নেতার লিখিত সুপারিশ থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব রাজনৈতিক সুপারিশ নিয়োগে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত মো. দেলোয়ার হোসেনের মেয়ে সাদিয়া বিনতে হোসাইন তিথিও তথ্য সংগ্রহকারী পদে নির্বাচিত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

‘টাকার বিনিময়ে নিয়োগের’ অভিযোগ রাজাপুর বিএনপির একাংশের একাধিক নেতাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, নির্বাচিতদের কয়েকজনের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে উপজেলা প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

তবে অর্থ লেনদেনের এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নথিপত্র বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযোগকারীরাও প্রকাশ্যে এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

অন্যদিকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কয়েকজন আবেদনকারী বলেন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হবে—এমন আশ্বাসে তাঁরা সময় ও অর্থ ব্যয় করে আবেদন ও পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টি সামনে আসায় তাঁরা হতাশ হয়েছেন।

যা বলছেন অভিযুক্তরা রাজাপুর সদর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি পদপ্রার্থী মো. নূর হোসেন হৃদয় ওরফে চশমা সুমন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি মেধার ভিত্তিতে যোগ্য হয়েই নির্বাচিত হয়েছি। এখানে কোনো দলীয় বিবেচনা ছিল না। অধিকাংশ প্রার্থীর যোগ্যতা না থাকায় তারা বাদ পড়েছেন। আমার প্রতিপক্ষরা এখন আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলছেন।”

দলীয় সুপারিশের অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহ পারভেজ বলেন, “ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে আমার কোনো আত্মীয়স্বজন সুযোগ পায়নি। প্রশাসন শতভাগ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়েছে। আমাদের কোনো সুপারিশ কাজ করেনি।”

নিয়োগ বোর্ডের বক্তব্য ফ্যামিলি কার্ড তথ্য সংগ্রহ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল বলেন, ভাইভা বোর্ডের মাধ্যমে ফলাফল তৈরি করে মেধাবীদের নির্বাচন করা হয়েছে। কোনো প্রার্থীকে রাজনৈতিক সুপারিশে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

গালুয়া ইউনিয়নের এক প্রার্থীর আবেদনে বিএনপি নেতার সিল-স্বাক্ষরসহ লিখিত সুপারিশ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওই ব্যক্তি ভাইভায় পাস করেছেন। এ কারণেই তাঁকে নেওয়া হয়েছে।”

নিয়ম না মেনে আবেদন করা কোনো প্রার্থীকে কীভাবে নির্বাচিত করা হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “নিয়ম না মেনে আবেদন করলে বাদ দিতে হবে—এমন কথা বিজ্ঞপ্তিতে লেখা নেই।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরি বলেন, “সকল নিয়ম মেনেই নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে। কারও কোনো অভিযোগ থাকলে লিখিতভাবে দিলে বিষয়টি দেখা হবে।”

হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার এমপির নিয়োগে নিজের হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল। তিনি বলেন, “এই নিয়োগ ৪৫ দিনের জন্য। তথ্য সংগ্রহকারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন। নিয়োগ বোর্ড প্রার্থীদের সব যোগ্যতা যাচাই করেছে। আমি এ নিয়োগের বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করিনি।”

তিনি আরও বলেন, “একটি মহল ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমকে বিতর্কিত করার জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ঢুকতে চেয়েছিল। তারা তা পারেনি। এখন মিথ্যা প্রচার করছে।”

ছাত্রলীগের একজন নেতা চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে এমপি বলেন, “সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। তবে কোনো অপরাধে জড়িত ব্যক্তি নিয়োগ পেয়ে থাকলে তার দায় নিয়োগ বোর্ডের।”

ফ্যামিলি কার্ড শুমারির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যক্রমে নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, প্রকৃত মেধাবীদের বাদ দিয়ে যদি কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব নিয়োগে কাজ করে থাকে, তাহলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।