হাইকোর্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ, বাউফলে আতঙ্কে একাধিক পরিবার

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২১:২৪, আগস্ট ১৫ ২০২৬ মিনিট

নিজস্ব প্রতিবেদক : পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার মদনাপুরা ইউনিয়নের বিলবিলাশ এলাকায় মহামান্য হাইকোর্টের সহকারী প্রোগ্রামার হাসান গাজীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার প্রভাব খাটানো, বিরোধপূর্ণ জমি দখল, ভুক্তভোগীদের হয়রানি এবং স্থানীয় কতিপয় মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ, সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও একাধিক মামলার তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।হাসান গাজী পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক বাউফল পৌর মেয়র জিয়াউল হক জুয়েলের ভাগ্নে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। জিয়াউল হক জুয়েল বাউফল পৌরসভার সাবেক মেয়র ছিলেন—এ তথ্য বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনেও এসেছে।

স্থানীয় একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, হাসান গাজী এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে একটি নিজস্ব বলয় তৈরি করেছেন। তাদের দাবি, স্থানীয় কতিপয় মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে ওই বলয়কে শক্তিশালী করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ বলয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন আহাদুল ইসলাম খান টিপু, যিনি অতীতে ইয়াবা সেবনের একটি ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছিলেন বলে স্থানীয়দের দাবি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাসান গাজী ও তার অনুসারীদের কারণে মদনাপুরা ইউনিয়নের বিলবিলাশ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, তার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করলে উল্টো অভিযোগকারীকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও অপদস্থ করার চেষ্টা করা হয়।

অভিযোগ ও মামলার নথির বরাত দিয়ে ভুক্তভোগীরা জানান, প্রতিবেশী মৃত আবুল হোসেন মৃধা ও সুলতান মৃধার পরিবারের সঙ্গে হাসান গাজীর পরিবারের দীর্ঘদিনের জমি-সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। এ বিরোধের জেরে ২০২০ সাল থেকে সহকারী জজ আদালত ও পটুয়াখালী জজ আদালতে উভয় পক্ষের মধ্যে একাধিক মামলা হয়েছে। মামলাগুলো বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় বিরোধপূর্ণ ওই জমিতে হাসান গাজীর বাবা মোতালেব গাজী পাকা স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এতে মামলার বাদীপক্ষের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়। মৃত সুলতান মৃধার দুই পূত্রকে হাসান গাজী তার সরকারি চাকরির পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করছেন। এমনকি তাদের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংস্থার কাছে নামে-বেনামে কাল্পনিক অভিযোগ দিয়ে প্রশাসনিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও তারা দাবি করেছেন। স্থানীয় চেয়ারম্যান মো. গোলাম মোস্তফা একাধিকবার উভয় পক্ষকে নিয়ে শালিস-মীমাংসার উদ্যোগ নিলেও হাসান গাজীর পক্ষ থেকে তা মানা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

তাদের দাবি, একাধিকবার অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করা হলেও পরবর্তীতে সেগুলো ভঙ্গ করা হয়েছে। ফলে স্থানীয়ভাবে বিরোধের সমাধান না হয়ে বরং তা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।

ছোকানুর বেগমের পূত্রের অভিযোগ, বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান থাকা সত্ত্বেও প্রতিপক্ষ প্রভাব খাটিয়ে সেখানে দখল ও নির্মাণকাজ চালানোর চেষ্টা করছে। এ ঘটনায় তিনি আইনের সহায়তা চেয়ে চলতি বছরের ১৯ মার্চ পটুয়াখালী পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন বলে জানান। হাসান গাজীর বিরুদ্ধে হয়রানি ও জমি-সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে স্থানীয় ভুক্তভোগীরা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার, বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি, পটুয়াখালী পুলিশ সুপার ও বাউফল থানাসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে।

মৃত মো. আবুল হোসেনের স্ত্রী রাবেয়া বেগম হাসান গাজীর বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে দাবি করেছেন। ফয়জর আলী দফাদারের মেয়ে ছোকানুর বেগম (৬৮) অভিযোগ করেন, হাসান গাজীর পক্ষের লোকজনের হয়রানির কারণে তিনি বাড়িছাড়া হওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েছেন। এ ঘটনায় তিনি বাউফল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন বলে জানান।

অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই জিডির নম্বর ৪৭৪/২৬ হাসানের বিরুদ্ধে জমি-সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে খাদিজা বেগম বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজিসহ প্রশাসনের একাধিক দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে স্থানীয় মো. রেজা মোল্লা হত্যা ও গুমের আশঙ্কার অভিযোগ তুলে বাউফল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন বলে অভিযোগকারীদের কাছ থেকে জানা গেছে। ওই জিডির নম্বর ৫০০। হাসান গাজীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকায় তার পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকেও অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তার আপন চাচি মোসা. রুমা বেগম পটুয়াখালী আদালতে হাসান গাজী ও তার বাবা মোতালেব গাজীকে আসামি করে মামলা করেছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া রাবেয়া বেগম, খাদিজা বেগম, ছোকানুর রহমানসহ আরও কয়েকজন ব্যক্তি হাসান গাজীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করেছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাসান গাজীর বাবা মোতালেব গাজী একসময় আনসার ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন এবং পরবর্তীতে চাকরিচ্যুত হন। তার বিরুদ্ধে চুরি মামলায় কারাভোগের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। অভিযোগকারীদের দাবি, স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুর রশিদ একসময় মোতালেব গাজীকে নিজের জিম্মায় জামিনে বের করে আনেন। চুরি মামলায় হাসানের পিতা মোতালেবের জেল খাটার বিষয়টি সাবেক মেম্বার আব্দুর রশিদের স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও থেকে নিশ্চিত হয়ে গেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একের পর এক মামলা, জিডি ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও তারা কাঙ্খিত প্রতিকার পাচ্ছেন না। বরং অভিযোগ করার পর তাদের ওপর চাপ ও হয়রানি আরও বেড়েছে। তাদের দাবি, আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায়ও বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে এক পক্ষের কর্মকান্ড অব্যাহত থাকায় তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্তে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও বিভিন্নভাবে চাপের মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীরা বলেন, “আমরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি আইনগত সমাধানের আশায়। কিন্তু মামলা চলমান থাকার পরও যদি প্রভাব খাটিয়ে বিরোধপূর্ণ জমিতে স্থাপনা নির্মাণ করা হয় এবং অভিযোগকারীদেরই হয়রানির শিকার হতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ আইনগত প্রতিকার কোথায় পাবে?” তাদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং কেউ অপরাধে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। হাসান গাজীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়া জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।