বরিশালে ঘাট ইজারাদার বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২১:০৪, আগস্ট ১৫ ২০২৬ মিনিট

বরিশালের লাহারহাট ফেরিঘাটে ইজারা উত্তোলনের পাশাপাশি স্থানীয় এক বিএনপি নেতা ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করে চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হয়েছেন। অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার পাশাপাশি চাঁদপুরা ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক সাইফুল খান লোকজন দিয়ে পরিবহন সিরিয়ালের নামে ১০০ করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। প্রতিদিন অন্তত শতাধিক পরিবহন থেকে অবৈধভাবে উত্তেলিত এই ১০ হাজারের বেশি টাকা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং নিজেদের মধ্যেকার ভাগবাটোয়ারা করছেন। বিষয়টি নিয়ে পরিবহন মালিক শ্রমিকসহ স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের ক্ষোভ থাকলেও বিএনপি নেতা সাইফুলের প্রভাবের কারণে কেউ মুখ খোলার সাহস দেখাচ্ছেন না। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ইজারাদার ও বরিশাল বন্দর বিভাগের যোগসাজোসে আওয়ামী লীগের শাসনামলেও এই ধরনের চাঁদাবাজি সদর উপজেলার লাহারহাট ফেরিঘাটে চলছিল। এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে ক্ষমতার পালাবদল হলে পরিবহন মালিক শ্রমিক এবং স্থানীয়দের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে মুখে পড়েন তৎকালীন ইজারাদার রেজাউল। তখন এনিয়ে তুমুল বিতর্কের একপর্যায়ে সেনাবাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবৈধভাবে পরিবহন থেকে ১০০ টাকা করে উত্তোলন বন্ধ করে দেয়। সূত্র জানায়, এরপরে বরিশাল মহানগর ১০ নং ওয়ার্ড বিএনপি নেতা মো. কামরুজ্জামান দীর্ঘ এক বছর ঘাটটি পরিচালনা করলেও তিনি এই অবৈধ টাকা বা অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন বন্ধ রেখেছিলেন। পরিবহন মালিক শ্রমিকদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পরে সিরিয়ালের নামে ১০০ টাকা নেওয়া বন্ধ ছিল, এমনকি পরিবহন থেকেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়নি। কিন্তু চলতি বছরের জুলাই মাসের ১ তারিখ থেকে ইজারাদার স্থানীয় বিএনপি নেতা সাইফুল খান এই চাঁদাবাজির রীতি ফের চালু করাসহ প্রতিটি পরিবহন থেকে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করছেন। বিএনপি নেতার সাথে এই চাঁদাবাজিতে সামিল আছেন সাবেক ইজারাদার রেজাউল ইসলাম। তাকে আওয়ামী দোসর বলা হয় এবং তিনিই মূলত সাইফুলকে অবৈধপন্থায় অর্থ উপার্জনের পথ বাতলে দেন। তাদের দুজনের নির্দেশনার আলোকে মাঠপর্যায়ে অর্থাৎ ঘাটে চাঁদাবাজিতে নিয়োজিত আছেন আল আমিন, সাইদুল এবং পরশ নামের তিন যুবক। শুক্রবার সরেজমিনে গেলে খোদ ইজারাদারের এই চাঁদাজিবর বিষয়টি প্রত্যক্ষ করা যায়। এবং ইজারা উত্তোলনে নিয়োজিত রাহান নামের এক যুবক স্বীকারও করেন প্রতি গাড়ি থেকে ১০০ টাকা হারে নেওয়া হয়, যা আল আমিন, সাইদুল এবং পরশ তুলে থাকেন। এই সংক্রান্ত একটি গোপন ভিডিও এ প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে। ইজারাদার বিএনপি নেতা সাইফুলের এই চাঁদাবাজির ঘটনা নিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যেও ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয় একাধিক বিএনপি নেতা অভিযোগ করেন, পরিবহন থেকে ৭৫ টাকা করে ইজারা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তারা অনেক বেশি নিচ্ছেন, এমনকি কখনও কখনও ১৫০ থেকে ২০০ টাকা টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন। যদি কোনো পরিবহন শ্রমিক তাদের প্রত্যাশিত অর্থ না দেন, তখন তাদের গালিগালাজ করাসহ শারীরিকভাবে হেনস্থা করা হয়। এক মাসের অধিক সময় ধরে লাহারহাট ফেরিঘাট কেন্দ্রিক এই চাঁদাবাজি চললেও সংশ্লিষ্ট বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ তা রোহিতকরণে কোনো ভূমিকা রাখছে না, এমনকি তাদের অবহিত করা হলেও রহস্যজনক কারণে প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ সরকারি আইন অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিএ’র প্রতিটি ঘাটে রেট চার্ট ঝুলিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বরিশাল বন্দর বিভাগকে দীর্ঘদিনেও এই ধরনের কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। এক্ষেত্রে কজন সাবেক ইজারাদারের অভিযোগ হচ্ছে, রেট চার্ট টাঙিয়ে রাখলে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বা সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজি করা সম্ভব নয়। এই কারণে রেট চার্ট না টাঙিয়ে ইজারাদার পরিবহন মালিক শ্রমিকদের জিম্মি করছে, অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এবং দিন বা মাস থেকে ভাগবাটোয়ার অর্থ তাদের কাছেও পৌছে যায়, যাচ্ছে। পরিবহন থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং সিরিয়ালের নামে প্রতি পরিবহন থেকে ১০০ টাকা চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে ইজারাদার বিএনপি নেতা সাইফুল খানকে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। এর আগে তার সহযোগী রেজাউলকে ফোন করা হলে তিনি অভিযোগসমূহ মিথ্যে এবং ভিত্তিহীন বলে দাবি করলেও কিছুক্ষণ পরে বলেন ঘাট মালিকই তিনি নন। অবশ্য তার কিছুক্ষণ পরেই আবার এই রেজাউল এ প্রতিবেদককে ফোন করে সাক্ষাৎ করে চা খাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং তিনি এবার নিজেকে ঘাট ইজারাদার পরিচয় দেন। তাহলে প্রথমে অস্বীকার করলেন কেনো প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে তিনি তালগোল পাকিয়ে ফেলেন এবং মোবাইল সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। ফেরিঘাট ইজারা নিয়ে বিএনপি নেতা সাইফুলের এই চাঁদাবাজি সম্পর্কে মোটেও ওয়াকিবহাল নন বলে জানিয়েছেন বরিশাল বন্দর কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান। সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজির ভাগ নেওয়ার বিষয়টিকে অস্বীকার করে তিনি বলছেন, আগে এগুলো ছিল, কিন্তু ৫ আগস্টের পরেতো বন্ধ হয়েছে। এখন যেহেতু নতুন করে ইজারাদারের বিরুদ্ধে সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজি এবং অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ এসেছে, সেক্ষেত্রে তাদের নোটিস দেওয়া হবে। পাশাপাশি ফেরিঘাটে একটি রেট চার্ট ঝুলিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ১ জুলাই ইজারা কার্যকরের দিন থেকে রেট চার্ট কেনো লাগানো হয়নি প্রশ্ন করা হলেও বন্দর কর্মকর্তা প্রতিত্তোরে বলেন, রোববার অফিস খোলার দিনে ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে। সূত্রের খবর হচ্ছে, বরিশাল বন্দর কর্তৃপক্ষের আওতাধীন ৭৫টির বেশি ঘাট বা ইজারা পয়েন্ট রয়েছে। কিন্তু একটিতেও রেট চার্ট টাঙানো হয়নি। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অভিযোগ, রেট চার্ট টাঙানো হলে সিরিয়ালের নামে বাণিজ্য এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবেÑ এমন শঙ্কায় ইজারাদার ও বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা যোগসাজোস করে সবকিছু আড়ালে রাখছেন।’