ছুটির রাতে খোলা ঝালকাঠি পৌর ভূমি অফিসে তহশিলদার, অর্থ আদায়ের অভিযোগে নতুন প্রশ্ন
সরকারি ছুটির রাতে ঝালকাঠি পৌর ভূমি অফিস খোলা থাকা, গভীর রাত পর্যন্ত তহশিলদারের অবস্থান এবং সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
গত শুক্রবার রাত প্রায় ১১টার দিকে সরেজমিনে ঝালকাঠি পৌর ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, অফিসের ভেতরে আলো জ্বলছে এবং দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। কয়েকবার কড়া নাড়ার পর ভেতর থেকে জানতে চাওয়া হয়, ‘কে, কী দরকার, কেন এসেছেন?’ পরে দরজা খুলে দেন তহশিলদার মো. আবুল বাশার। এ সময় তাঁকে একাই সরকারি নথিপত্র নিয়ে কাজ করতে দেখা যায়।
এর আগে একই দিন রাত নয়টার দিকে অফিসের সামনে দুই ব্যক্তিকে কাগজপত্র হাতে নিয়ে তহশিলদারের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁরা দ্রুত সেখান থেকে চলে যান।
পরে তহশিলদারের অনুমতি নিয়ে তিনজন গণমাধ্যমকর্মী অফিসে প্রবেশ করেন। পুরো ঘটনার ভিডিওচিত্রও ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এত রাতে অফিসে অবস্থানের কারণ জানতে চাইলে তহশিলদার আবুল বাশার বলেন, “আমার কাজ থাকতে পারে, আমি কাজ করছি। এতে আপনাদের সমস্যা কোথায়?” তিনি দাবি করেন, একাধিক দায়িত্ব পালনের কারণে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সেটেলমেন্ট অফিসসহ বিভিন্ন দপ্তরে নিয়মিত যাতায়াত করতে হয়। ফলে দিনের নির্ধারিত সময়ে সব কাজ শেষ করা সম্ভব হয় না।
নির্ধারিত সময়ের বাইরে একা অফিস খুলে সরকারি নথিপত্র নিয়ে কাজ করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপনাদের যদি সমস্যা হয়, তাহলে আর রাত জেগে জনগণের সেবায় কাজ করব না।”
অন্যদিকে, ভূমিসেবা নিতে আসা কয়েকজন অভিযোগ করেন, দিনের বেলায় অনেক কাজ সম্পন্ন না করে সন্ধ্যা কিংবা রাতে অফিসে ডেকে নেওয়া হয় এবং অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে কাজ করে দেওয়া হয়।
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ওই রাতে অনুসন্ধান চালানো হয়। তবে প্রথমে রাতে সেবাগ্রহীতাদের অফিসে আসার বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরে তথ্য-প্রমাণের বিষয়টি জানানো হলে তহশিলদার বলেন, “আমার কাছে লোক আসতেই পারে, যেমন আপনারাও এসেছেন।”
অভিযোগ রয়েছে, কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি বিষয়টি নিয়ে আর এগিয়ে না যাওয়ার অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে উপস্থিত সাংবাদিকদের চা-নাশতার খরচ হিসেবে নগদ টাকা দেওয়ারও চেষ্টা করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভূমি অফিসসংলগ্ন বারোচালা এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, প্রায়ই গভীর রাত পর্যন্ত তহশিলদারকে অফিসে অবস্থান করতে দেখা যায়। রাত ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যক্তির যাতায়াত থাকলেও সেখানে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়, সে বিষয়ে তাঁদের কোনো ধারণা নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মো. আবুল বাশার দীর্ঘদিন ঝালকাঠি পৌর ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে তিনি কীর্তিপাশা ও পোনাবালিয়া ভূমি অফিসে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে পোনাবালিয়া ভূমি অফিসের পাশাপাশি ঝালকাঠি পৌর ভূমি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন।
এদিকে, কামারপট্টি এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, তাঁর বাবার জমির নামজারির জন্য প্রথমে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হয়। যদিও সরকারি নির্ধারিত নামজারি ফি ছিল এক হাজার ১৭০ টাকা। অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তাঁকে বলা হয়, “অনেক টেবিল পার হয়ে কাজ করাতে হয়।”
ওই ব্যক্তি আরও অভিযোগ করেন, তাঁদের দোকান থেকে দুই হাজার টাকার বেশি মূল্যের পণ্য নেওয়া হলেও এর মূল্য পরিশোধ করা হয়নি।
এ ছাড়া, চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল ঝালকাঠি সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর দাখিল করা একটি লিখিত অভিযোগে এক সেবাগ্রহীতা দাবি করেন, নামজারির জন্য তাঁর কাছ থেকে ছয় হাজার টাকা নেওয়া হলেও সরকারি ডিসিআরে উল্লেখ ছিল মাত্র এক হাজার ১০০০ টাকা।
এ বিষয়ে ঝালকাঠি সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস. এম. মেহেদী হাসান বলেন, এপ্রিল মাসে জমা পড়া অভিযোগটি তদন্তাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, দাপ্তরিক প্রয়োজন হলে সরকারি ছুটির দিন বা নির্ধারিত সময়ের বাইরেও অফিসিয়াল কাজ করা যেতে পারে। তবে ওই সময়ে কোনো সেবাগ্রহীতাকে সেবা দেওয়া যাবে না।’
তিনি আরও বলেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ঝালকাঠির সভাপতি সত্যবান সেন গুপ্ত বলেন, ভূমিসেবা সাধারণ মানুষের অন্যতম মৌলিক সরকারি সেবা। এ খাতে অনিয়ম বা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনগণের হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে সরকারি দপ্তরগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
