বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে উপ-পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

এ.এ.এম হৃদয় | ২২:৫৯, আগস্ট ০৪ ২০২৬ মিনিট

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালানোর পরে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের কোন অনুষ্ঠান করা না হলেও বরাদ্দের সব টাকা আত্মসাত করেছেন। শিক্ষা পদক সংক্রান্ত বিভাগীয় বাছাই সম্পন্ন করে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সনদ ও পুরস্কার বিতরণের নির্দেশনা থাকলেও তিনি তা না করে বরাদ্দকৃত টাকা আত্মসাত করেছেন। ২০২২ ও ২০২৩ সালে কম্পিউটার থেকে সনদপত্র প্রিন্ট করে প্রদান করেছেন। কোন অনুষ্ঠান করেননি। প্রথম স্থান অধিকারীদের কেউ কেউ অফিসে এসে অথবা সংশ্লিষ্ট জেলা বা উপজেলা অফিস থেকে সনদ সংগ্রহ করেছেন। অনুষ্ঠান না করেও বিল করে করেছেন অর্থ আত্মসাৎ। ২০২২ ও ২০২৩ সালে জাতীয় পর্যায়ে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় ঢাকায় উপস্থিত না থেকেও ঢাকা ভ্রমণের জন্য টিএ বিল উত্তোলন করেন। ২০২২ সালে ১৫ দিন শ্রান্তি বিনোদন ছুটির সাথে অবৈধভাবে আরো প্রায় ১৫ দিন অফিস করেননি। এক মাস অফিসের গাড়ীটি না চললেও ঐ মাসে জ্বালানী বাবদ সমুদয় অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন।

সরকারি অফিসকে পারিবারিক সম্পত্তিরুপে ব্যবহার : অফিসের গাড়িটি তিনি তার ছেলে-মেয়েদের স্কুল ও কোচিং এ আনা নেয়ার কাজে ব্যবহার করেন। প্রতিদিন কমপক্ষে ৬ থেকে ৮ বার তার ছেলে-মেয়েকে স্কুলে ও কোচিং এ আনা নেওয়া করা হয় এবং সরকারি অফিসের এই গাড়ির চালককে এসব কাজে বাধ্য করেন তিনি। কোন জেলা বা উপজেলায় পরিদর্শনে গেলে পিটিআই বা ডিপিইও অফিসের গাড়ি ব্যবহার করেন। অথচ জ্বালানী তেল পুরাটাই উত্তোলন করে খরচ দেখান। গত ২০২৪ সালের ১৫ নভেম্বর নেছারাবাদ উপজেলা পরিদর্শণের জন্য ঐ শিক্ষা অফিসারকে দিয়ে গাড়ি ভাড়া করিয়েছেন।তিনি অফিসের ২ জন অফিস সহায়ক, নৈশ প্রহরী, পরিচ্ছন্ন কর্মী, চালক এবং অফিস সহকারি কাম কম্পিউটার অপারেটর শাহ আলমকে তার ছেলে মেয়েদের স্কুল ও কোচিং এ আনা নেয়া এবং ব্যক্তিগত বিভিন্ন কাজে সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখেন বিধায় অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় । তিনি তার ব্যক্তিগত হীনস্বার্থ হাসিলের জন্য দরিদ্র পরিচ্ছন্ন কর্মী আকলিমা বেগম এর বেতন আটকিয়ে রেখে তাকে মোবাইল ফোন কিনতে বাধ্য করেছেন যাতে তিনি ডাকা মাত্র তার ডাকে সাড়া দিতে পারেন। আকলিমাকে দিয়ে ব্যক্তিগত যাবতীয় গৃহস্থলির কাজ করান। সকাল ৮/৯ টা থেকে রাত ৯/১০ টা পর্যন্ত তাকে দিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করান বিধায় আকলিমা বেগম অফিসের নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কাজ করার সময় পায় না।

বরিশাল সদরের কিশোর মজলিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো: আল মামুনকে স্কুল চলাকালীন সময়ে অফিসের গেস্ট হাউজে এসে তার ছেলেকে প্রাইভেট পড়াতে বাধ্য করেন তিনি। ঐ বিদ্যালয়ের শিক্ষক জায়েদা সহ অন্যদের প্রবল আপত্তির জন্য বর্তমানে স্কুল সময়ে আসা বন্ধ হয়েছে। আপত্তির কারণে জায়েদা চরম রোষানলে পড়েছেন এবং তাকে দেখে নেয়ার হুমকি প্রদান করা হয়েছে।

টাকা ছাড়া মেলেনা সেবা : প্রাথমিক শিক্ষক-কর্মচারীদের পাসপোর্ট তৈরি ও নবায়নে এনওসি প্রদান, শিক্ষা ছুটি মঞ্জুর, উচ্চতর স্কেল প্রদানসহ যে সকল কাজ বিভাগীয় অফিস থেকে করতে হয় তার প্রত্যেকটি কাজে অর্থ না দিলে কোনো ফাইল তিনি ছাড়েন না। টাকা ছাড়া ফাইল স্বাক্ষর হয়না বিভাগীয় এই অফিসে।

এ বিষয়ে সম্প্রতি অর্ধগড় বেতনে এবং বিনা বিতনে ছুটি পাওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পারিবারিক প্রয়োজনে এক মাসের ছুটির আবেদন করি। তবে ছুটি না পাওয়ায় প্রথমে উপজেলা শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করলে কর্মকর্তা আমাকে বিভাগীয় অফিসে কথা বলতে বলেন। অফিসে কথা বলে বুঝতে পারি টাকা ছাড়া এখানে কিছু করা সম্ভব নয়। পরে বাধ্য হয়ে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে আমি ছুটি মঞ্জুর করি।

অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললেই চলে শোকজ, বিভাগীয় মামলার ভয় এবং এসিআর খারাপ করে দেওয়ার হুমকি: নিলুফার ইয়াসমিন অতি সাধারণ বিষয়েও কর্মকর্তা/কর্মচারীদের শোকজ করার এবং বিভাগীয় মামলার ভয় দেখিয়ে ধমক দেন। ভবিষ্যতে এসিআর খারাপ দেয়ার ভয় দেখান। শোকজ এবং বিভাগীয় মামলা ও এসিআর খারাপের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস করেনা। অফিসের যাবতীয় নথি শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে উপাস্থাপন করার বিধান থাকলেও তিনি তা মানেন না। তিনি খেয়াল খুশি মতো নথি ছাড়াই অনেক প্রশাসনিক ও আর্থিক কাজ করে থাকেন। কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষা অফিসার বাইরে আছেন লিখিয়ে নথি উপাস্থাপন করতে বলেন। অফিস সহকারি শাহ আলমকে শিক্ষা অফিসারকে বাদ দিয়ে সরাসরি ফাইল উপাস্থাপন করতে বলেন। শাহ আলম তাই করে থাকে।

বদলির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় : নিলুফা ইয়সামিন তার অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর শাহ আলমের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে উৎকোচ ও উপঢৌকন গ্রহণ করেন। শাহ আলম জেলা ও উপজেলা অফিসে ফোন করে জানান যে, তাকে ছাড়া ম্যাডাম অন্য কাউকে বিশ্বাস করেন না। তাই সকলকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কর্মচারীদের কর্মকাল সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে তা শাহ আলমের নিকট দিয়েছেন। শাহ আলম ঐ তালিকা দেখে দেখে বেশিদিন কর্মকাল হয়েছে এমন কর্মচারীদের ফোন করে বদলীর ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করেন। শাহ আলমের কার্যক্রম সম্পর্কে তাকে অবহিত করলে তিনি কোন কর্ণপাত করেননা। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে অন্য কর্মকর্তা কর্মচারিদের বঞ্চিত করে শাহ আলমকে ১৪ হাজার ৫০৬ টাকার টিএ বিল দিয়েছেন। তার প্রশ্রয়ের কারণে শাহ আলম সবাইকে হুমকী দিয়ে কথা বলেন।

কর্মচারী বদলির ক্ষেত্রে কোন নিয়ম নীতির তোয়ক্কা করেন না। প্রশাসনিক কারণে আবুল কালামকে দশমিনা থেকে রাজাপুর বদলী করে আবার ৪ মাস পর শাহ আলমের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা নিয়ে তাকে বাউফল উপজেলায় বদলী করা হয়। সম্প্রতি ৪ জন টেকনিক্যাল ক্যাটাগরি সহ ৬ জনকে জনস্বার্থে বদলি করা হয়। এর মধ্যে একই দপ্তরের ২ জনকে একত্রে অন্যত্র বদলি করা হয়, যদিও তাদের বিরুদ্ধে কোন লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ ছিলনা। এতে ঐ দপ্তরে কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সমন্বিত বদলি নির্দেশিকা ২০২৩ এ মহাপরিচালকের অনুমোদন গ্রহণের বিধান থাকলেও তা করা হয়নি। এমনকি কোন ফাইল নোট ও দেয়া হয়নি।

সাটলিপিকার মো: আরিফ হোসেন বিগত ৪/৫ মাস পূর্বে অবসর গ্রহণ করলেও তার কাজ অফিসের অন্য কাউকে বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। তিনি বিভাগীয় মামলা সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি এখনও তার দখলে রেখেছেন। তার মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা আদায় সহজ হয় বলে এখনো তাকে দিয়ে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করানো হয়। শাহ আলমের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা আদায় নিশ্চিত হলে তাকে ফোন করে অফিসে আনা হয়। সে নথি তৈরি করে দিলে শাহ আলমের মাধ্যমে উপস্থাপন করে তা নিষ্পন্ন করা হয়।

একাধিক কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং শিক্ষকদের সাথে কথা বললে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আমরা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগীয় অফিসে জিম্মি। যখন নিলুফা ইয়াসমিনের বদলির আদেশ হলো তখন আমরা ভেবেছিলাম এই জিম্মি দশা থেকে মুক্তি পেলাম। পরবর্তী দেখলাম সেই আদেশ বাতিল হয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকারের পতন হলে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম। এই কালো টাকার সিস্টেম বদলাবে। কিন্তু তা না আমাদের ভাগ্যের আর বদল হলো না। বিভাগীয় অফিসেই আমরা জিম্মি হয়ে থাকতে হচ্ছে।

প্রাথমিক শিক্ষকদের কোচিং বানিজ্যে উৎসাহিত করা: সম্প্রীতি বিভিন্ন অনলাইল নিউজ পোর্টাল ও স্থানীয় দৈনিকে বরিশাল সদর উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের কোচিং বানিজ্যের সংবাদ প্রকাশ হলে, তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নামে একটি চিঠি যাহার স্মারক নং-৩৮.০১.১০০০.০০০.২৭.০১.২০২৬.৩৮৯ প্রত্যেক স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের লিখিত ভাবে জানান, কোচিং করানো যাবে তবে স্কুল সময়ের পরে। অথচ শিক্ষামন্ত্রী বলছে স্কুল শিক্ষকদের বাহিরে বানিজ্যিক কোচিং চলবে না। শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনা কর্ণপাত না করে তিনি অর্থ আদায়ের মাধ্যমে নিজস্ব ক্ষমতা বলে চালিয়ে যাচ্ছেন এ সকল অপকর্ম।

ডেপুটেশন বানিজ্য: মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বরিশাল বিভাগীয় উপ-পরিচালক নিলুফার ইয়াসমিন ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: মোস্তফা কামাল শিক্ষকদের সুবিধা মতো ডেপুটেশনের মাধ্যমে বদলী করা হয়। গত ২৪/০৬/২০২৬ ইং তারিখে ৮ জন শিক্ষকের ডেপুটেশন বদলীর চিঠি যাহার স্মারক নং-জেপ্রাশিঅ/বরি/১০৭০ প্রেরণ করা হয়েছে। তাদের এসব কাজে সহায়তা করেন উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার জাবের ও শিক্ষক নেতা ভাটিখানা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তারিকুল ইসলাম পলিন্স, ১৯১ নং কিশোর মজলিস সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইলিয়াস আলী খান, মো: আনোয়ার হোসেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা এ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় অফিসের উপ-পরিচালক নিলুফার ইয়সামিনকে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেন নি।