বরিশালে স্কুলের টিফিনের রুটিতে ব্লেডকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২২:৪০, জুলাই ৩০ ২০২৬ মিনিট

দেশব্যাপী আলোচিত বরিশালের গৌরনদী উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক ছাত্রীর মিড ডে মিলের রুটির মধ্যে ব্লেড পাওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তদন্ত কমিটি কোম্পানির গাফিলতি কিংবা রুটির মধ্যে ব্লেড ঢুকানোর কোনো তথ্য পায়নি। স্কুলের শিক্ষার্থী নিজেই রুটির মধ্যে ব্লেড ঢুকিয়ে দেওয়ার বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এছাড়াও তথ্য-উপাত্ত যাচাইবাছাই না করে ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে এক স্কুল শিক্ষিকাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সাময়িক বরখাস্ত হওয়া শিক্ষিকার নাম সারমিন জাহান। তিনি হরিসেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক গৌরনদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সেকেন্দার শেখ জানিয়েছেন, প্রতিবেদন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইব্রাহীম জানান, সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জ ছিলো ঘটনার সত্যতা উদ্ধার করা। পরবর্তীতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি নির্দেশে তদন্ত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তদন্ত টিম যেই কারখানা থেকে রুটি সরবরাহ করে সেই কারখানাটি সরেজমিন পরিদর্শন করে এবং রুটি তৈরি প্রত্যেকটা ধাপ তারা পর্যালোচনা করে। তারা প্রাকটিকালি মিক্সার থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা ধাপে ব্লেড দিয়ে দেখেছে যে কারখানা থেকে কোনোভাবেই এরকম একটা অক্ষত ব্লেড রুটির ভিতরে আসা সম্ভব না।

যে কারণে ঘটনাস্থল হরিসেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক কিংবা অভিভাবকদের মধ্যে থেকে কেউ চক্রান্ত করেছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য সব ধরনের পলিসি এপ্লাই করা হয় তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণের জন্য। এমনকি সংশ্লিষ্ট ছাত্রীর বাড়িতে কোন কোম্পানির ব্লেড ব্যবহার হয় সেই বিষয়ে খবর নেওয়া হয় এবং সেই ব্লেডও উদ্ধার করা হয়।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরও জানান, তারা কার কার সঙ্গে কথা বলেছে, কি কথা বলেছে। প্রতিবেশিরা কি কথা বলেছে, অন্যান্য শিক্ষার্থীরা একে অপরের সঙ্গে কি কথা বলেছে প্রত্যেকটা তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষন করে পুণরায় তাদেরকে তদন্ত কমিটি ডাকে। একপর্যায়ে ওই মেয়েটি অবলীলায় স্বীকার করে যে, ব্লেডটি তার ব্যাগে ছিলো। কিন্তু স্কুলে ব্লেড আনা নিষিদ্ধ তাই ব্যাগ থেকে ব্লেড বের করার পর তার মনে হয়েছে ম্যাডাম যদি ব্লেড দেখে তাহলে তাকে শাস্তি কিংবা বকা দিতে পারে। এজন্য সে ব্লেডটি রুটির মধ্যে লুকিয়ে ফেলে। পরবর্তীতে রুটি খাওয়ার জন্য যখন সে ভাংগে তখন পিছন থেকে জান্নাত নামের একটি মেয়ে ব্লেডটি দেখে ফেলে। তখন সে মনে করে জান্নাত যদি ম্যাডামকে বলে তাহলে ম্যাডাম বকা দিতে পারে।

এজন্য সে আগেই ম্যাডামের কাছে গিয়ে বলে ম্যাডাম আমি রুটির মধ্যে ব্লেড পেয়েছি। ম্যাডাম যাচাই-বাছাই না করেই ছবি তুলে শিক্ষকদের ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে ছড়িয়ে দেয়। এরপরে সদর ক্লাস্টার গ্রুপে ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। যার কারণে তথ্য উপাত্ত যাচাই-বাছাইয়ের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারের একটা ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার উপক্রম তৈরি হয়। যে কারণে তিনদিনের মধ্যেই চুলচেড়া বিশ্লেষণ করে তদন্ত কমিটি একটা প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনটি শতভাগ সঠিক বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

যদিও এর আগে রুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আইল্যান্ড ট্রেডিং করপোরেশনের প্রকল্প পরিচালক শাহ আলম খান জানিয়েছিলেন, কোকাকোলা ম্যানুফ্যাকচারিং নামের একটি কোম্পানি থেকে স্কুলগুলোতে রুটি সরবরাহ করা হয়। কোম্পানি ফুল অটোমেটিকভাবে রুটি মেনুফ্যাকচারিং করে। সেখানে যদি কোনো মেটাল যায় তা মিক্সিংয়ে ক্রাশ হয়ে যাওয়ার কথা। সেখানে এতো বড় একটা আস্ত ব্লেড থাকার কথা নয়।

স্কুল শিক্ষিকাকে বরখাস্তের বিষয়টি নিশ্চিত করে বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বলেন, সরকারি বিধি অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্তের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া শিক্ষিকা সারমিন জাহানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, গত বুধবার (২২ জুলাই) বরিশালের গৌরনদী পৌরসভার হরিসেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী আলমতাজ টিফিনের রুটি খাওয়ার সময় রুটি ছিঁড়ে তার ভেতরে একটি ব্লেড দেখতে পাওয়ার কথা শ্রেনী শিক্ষক সারমিন জাহানকে জানায়। যা পরবর্তীতে দেশব্যাপী আলোচিত হয়।