নুরুল ইসলাম আসলে কার!

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ১১:১৯, জুলাই ২৬ ২০২৬ মিনিট

  • মেধা পুরস্কার বিতরণে বিএনপি নেতাদের ঢল
  • সমালোচনার মুখে প্রধান শিক্ষক
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বরিশাল জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলামের একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে দিন দিন সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে স্কুলটির। স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্ষমতার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে তিনি সবসময়ই ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থাকার চেষ্টা করছেন। এক সময়ের তুখোর মুজিবপ্রেমী এই শিক্ষক নির্বাচনের আগেও জামায়াত বন্দনায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর সেই মুখোশ খুলে এখন আবার জিয়ার সৈনিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। তার এমন চেষ্টায় অনেকটা সফলও তিনি। কারণ একটাই, তিনি জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক। বরিশালবাসীর বড় একটি আবেগের জায়গা এই জিলা স্কুল। সম্প্রতি স্কুলটিতে অনুষ্ঠিত মেধা পুরস্কার ও সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। গত ২২ জুলাই বরিশাল সরকারি জিলা স্কুলে অনুষ্ঠিত হয় এ অনুষ্ঠানটি। তবে অনুষ্ঠানটি ছাত্রদের জন্য করা হলেও সেখানে দেখা গেছে বিএনপির অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার। শুধু একজন এমপির উপস্থিতি প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলামকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। এ সময় বিএনপির একাধিক নেতা-কর্মীর উপস্থিতি ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট মীর জাহিদুল কবির জাহিদ, আলহাজ নুরুল আমিন, আনোয়ারুল হক তারিন, এইচ এম তসলিম উদ্দিন এবং ফারহানা তিথিসহ বিএনপির আরও অনেকে। অনুষ্ঠানে আগত বিএনপির ১৫ জন নেতাকে দেওয়া হয়েছে দামি পাঞ্জাবি। এর একদিন আগেই ঘটা করে পালন করা হয়েছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকীর অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিসিসি প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান আক্তার শিরিন। অনুষ্ঠানে তাকেও বিশেষ পুরস্কৃত করা হয়েছিল। প্রায় একশ’ প্যাকেট বিরিয়ানির আয়োজন ছিল ওই অনুষ্ঠানে। পর পর স্কুলের দুটি অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জনকে প্রায় লক্ষাধিক টাকার উপহার প্রদান করেন নুরুল ইসলাম, যা পুরোপুরি শিক্ষার্থীদের অর্থ। এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান যেমন ঈদ, পহেলা বৈশাখ, ইংরেজি নববর্ষে বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য দামি দামি উপহার প্রদানের রেওয়াজটি সেই আওয়ামী লীগ আমলেই হাতেখড়ি দেওয়ার বিষয়টি এখনো পালন করছেন তিনি। এদিকে শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদানের উদ্দেশ্যে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন একাধিক অভিভাবকসহ নগরবাসী। তারা অভিযোগ করে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠান শিক্ষার্থী ও শিক্ষাবিষয়ক কর্মকা-ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। সেখানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করেছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। জানা গেছে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অনিতা রানী হালদারকে সরিয়ে ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন তিনি। যোগদানের সময় প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম স্কুলের শতাধিক কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ক্লাস বন্ধ রেখে কঠোর রোদের মধ্যে দাঁড় করিয়ে সংবর্ধনা নিয়েছেন। এ ঘটনায় স্কুলের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। জানা গেছে, এর আগে ২০২১ সালে বরিশাল জিলা স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। বরিশাল জিলা স্কুলে যোগদানের পর সুচতুর নুরুল ইসলাম সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ ও সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। এরপরই লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষকসহ সিন্ডিকেট করে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি শুরু করেন। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ২০২২ সালের জুলাই মাসে বরিশাল জিলা স্কুলের ফান্ড থেকে লাখ টাকা মূল্যের স্যামসাং ব্র্যান্ডের একটি টেলিভিশন ক্রয় করার কিছুদিন পর মেরামতের কথা বলে টিভিটি বাসায় নিয়ে যান। পরবর্তীতে স্কুল থেকে বদলি হয়ে গেলেও টিভি আর ফেরত দেননি তিনি। এছাড়াও স্কুলের ফান্ড থেকে ১টি ল্যাপটপ কম্পিউটার, ১টি ডেস্কটপ কম্পিউটার ও একটি প্রিন্টার মোট এক লাখ বাহান্ন হাজার টাকা দিয়ে ক্রয় করে ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ কম্পিউটার দুটি স্কুলে জমা দেননি নুরুল ইসলাম। স্কুলের ছাত্রদের কাছ থেকে প্রতি মাসে আইসিটি বাবদ ২০ টাকা করে আদায় করার পরেও এককালীন ছাত্রপ্রতি ২৪০ টাকা আদায় করতেন, যা সম্পূর্ণরূপে আইনপরিপন্থী এবং এই টাকার হিসাব কোনো শিক্ষকই তখন জানতেন না। এছাড়াও ভুয়া বিল করে স্কুলের উন্নয়নের নামে বিভিন্ন ফান্ডের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। সরকারি বিধি অনুযায়ী খরচ করার বিধান থাকলেও তিনি ওই বিধানের তোয়াক্কা না করে লোকদেখানো কিছু কাজ করে বেশিরভাগ টাকা পকেটস্থ করেছিলেন এবং শিক্ষকদের জোরপূর্বক ভাউচারে স্বাক্ষর নিয়েছিলেন। স্কুলের ক্রীড়া ফান্ড থেকে নিজ ও পরিবারের জন্য মোটা অঙ্কের টাকাও হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এমনকি বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের কারণে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল তাকে। ২০২৩ সালে বরিশাল-২ আসনের (উজিরপুর-বানারীপাড়া) সাবেক সংসদ সদস্য মো. শাহে আলম তালুকদারের নির্দেশে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত রাখায় দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিলেন তিনি, যা বিভিন্ন পত্রিকায় খবরের শিরোনাম হয়েছিল। এছাড়াও বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার আগের রাতে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র সরবরাহের অসংখ্য অভিযোগও রয়েছে নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। শুধু তা-ই নয়, স্কুলে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী না রেখে তাদের সম্মানী নিজেই আত্মসাৎ করতেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ঝালকাঠি হরচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছিল তাকে। এর আগে ঝালকাঠি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। সেখানেও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির পাশাপাশি নারী কেলেঙ্কারির মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। ঝালকাঠির এক অভিজাত হোটেলে নারীসহ ধরা পড়লে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পালিয়ে এসে বরিশাল জেলা শিক্ষা অফিসে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছিলেন। পরে তাকে বরগুনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। কিন্তু বরগুনাতেও তিনি একই ধরনের কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন এবং স্থানীয় জনগণের প্রতিরোধের মুখে তাকে দুই দিন অবরুদ্ধ হয়ে থাকতে হয়েছিল। বরগুনাতে নানা অঘটনের জন্ম দিয়ে কয়েক মাস পরই বদলি হন মাদারীপুর ইউনাইটেড সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। মাদারীপুরে অবস্থানকালে নুরুল ইসলামের দুর্নীতি আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা শাজাহান খানের সাথে পারিবারিক সখ্য গড়ে তুলে নাম ব্যবহার করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ম-নীতির কোনো রূপ তোয়াক্কা না করে সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের সাথে গোপনে সপরিবারে হজ পালন করেন। এমনকি দেশের বাইরে অবস্থানকালীন সময়ে অর্ধবেতনের নিয়ম-নীতি লঙ্ঘন করে তুলেছেন পুরো মাসের বেতন। গত বছর বরিশাল সরকারি জিলা স্কুলে যোগদানের পরপরই বিদ্যালয়ের তহবিল ব্যবহার করে নিজের ব্যবহারের জন্য স্কুলের কোয়ার্টারটি সংস্কার করান তিনি। সংস্কার শেষে গত বছর অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে তিনি সেখানে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক সুবিধা ভোগ করেন, তবে তিনি আবাসন ভাতা বা হাউস রেন্ট পাওয়ার অধিকারী নন। এই নিয়ম অমান্য করেই প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম কোয়ার্টারটিকে ‘বসবাসের অনুপযোগী’ দেখিয়ে বেতন থেকে বাড়িভাড়া না কাটার আবেদন করেন বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে। আবেদনের পর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী এইচ এম আব্দুর রহমান ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মামুন সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। তাদের প্রতিবেদনে প্রধান শিক্ষকের কোয়ার্টারটিকে “ব্যবহারের অনুপযোগী” উল্লেখ করে মেরামতের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয় এবং কনডেম ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত বেতন থেকে বাড়িভাড়া না কাটার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেদনে কোয়ার্টারটি ব্যবহারের অনুপযোগী ঘোষণা করার পরপরই প্রধান শিক্ষক ওই কোয়ার্টারে স্বাভাবিকভাবে বসবাস শুরু করেন। বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, কোয়ার্টারটি প্রধান শিক্ষক স্কুলের ফান্ড থেকে সংস্কার করিয়েছেন এবং বর্তমানে সেখানে কোনো সমস্যা ছাড়াই বসবাস করছেন। অথচ সরকারি নথিতে কোয়ার্টারটিকে ‘অব্যবহারযোগ্য’ দেখিয়ে ভাড়া কর্তন বন্ধ করার চেষ্টা চালিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলামের মূল বেতন ৭১,২০০ টাকা। বিধি অনুযায়ী তার হাউস রেন্ট ভাতা হওয়ার কথা মূল বেতনের ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ ২৮,৪৮০ টাকা। কিন্তু অক্টোবর মাসে তার বেতন থেকে মাত্র ১২,০০০ টাকা ভাড়া বাবদ কর্তন করা হয়েছে। বাকি ১৬,৪৮০ টাকা ভাড়া না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। ভবিষ্যতে যাতে হাউস রেন্ট ভাতার পুরো টাকাই আত্মসাৎ করতে পারেন, সেজন্য কোয়ার্টারকে ‘অব্যবহারযোগ্য’ দেখিয়ে এ ধরনের কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। গত বছর ২৮ নভেম্বর নগরীর পরিচিত কোচিং ‘রেটিনা’কে বিদ্যালয়ের ভবন ভাড়া দিয়ে মডেল টেস্ট গ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন তিনি। রেটিনা কোচিং সেন্টারের আয়োজনে প্রায় চার শতাধিক পরীক্ষার্থী অংশ নেয় ‘মেডিকেল মডেল টেস্ট’-এ। বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের নিচতলা ও তৃতীয় তলায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল ওই পরীক্ষা। পরে তৎকালীন জেলা প্রশাসক বিষয়টি জানতে পেরে পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলামের এহেন নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলামের স্কুলে যোগদানের পূর্বে তদন্ত আরও স্বচ্ছভাবে হওয়া উচিত ছিল।