কাজ নেই, নদীতে নামছে না জাল : অনাহারের মুখে ভোলার দিনমজুর ও জেলে পল্লীর শত শত পরিবার
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে ভোলার নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। নির্মাণকাজসহ সব ধরনের শ্রমনির্ভর কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজারো দিনমজুর। একই সঙ্গে উত্তাল নদী ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না জেলেরা। ফলে আয়-রোজগারের সব পথ বন্ধ হয়ে অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটছে জেলার বিভিন্ন জেলে পল্লী ও খেটে খাওয়া মানুষের।
সরেজমিনে জেলার পূর্ব ইলিশা, রাজাপুর, জোরখাল, ইলিশা তুলাতুলিসহ কয়েকটি জেলে পল্লী ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পরিবারের ঘরে খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও ভেজা ঘরে মানবেতর জীবনযাপন। কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ঘরে মজুত থাকা খাদ্যও প্রায় শেষ হয়ে গেছে। অনেক পরিবার ধার-দেনা করেও আর খাবার সংগ্রহ করতে পারছে না। ছোট ছোট শিশুদের কান্না আর অভিভাবকদের অসহায় মুখ যেন দুর্যোগের নির্মম বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
দিনমজুরদের ভাষ্য, প্রতিদিনের শ্রমই তাদের পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু বৃষ্টির কারণে নির্মাণকাজ, রাজমিস্ত্রির কাজ ও অন্যান্য শ্রমভিত্তিক পেশা পুরোপুরি বন্ধ থাকায় তারা আয়শূন্য হয়ে পড়েছেন। একদিন কাজ না করলে যাদের সংসারে খাবার জোটে না, তাদের কাছে টানা কয়েক দিনের কর্মবিরতি এখন বেঁচে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
এক জেলে বলেন, “কয়দিন ধইরা বৃষ্টি। নদীতে যাইতে পারি না। জাল-নৌকা ঘাটেই বাঁধা। ঘরে খাবার নাই। পোলা-মাইয়া লইয়া না খাইয়া আছি। কেউ আমাদের খবরও নেয় না।”
দিনমজুর রহিম মিয়া বলেন, “কাজ নাই, টাকা নাই। ঘরে এক মুঠো চালও নাই। বৃষ্টি থামলেই আবার কাজে নামতে পারব। কিন্তু ততদিন পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব, জানি না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্যোগে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর অনেকেই এখনো কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা পাননি। দ্রুত ত্রাণসামগ্রী, শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, দুর্যোগ চলাকালে অন্তত একটি পরিবারও যেন অনাহারে না থাকে, সে বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বাড়ছে। আর প্রতিটি দুর্যোগেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দিন এনে দিন খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ ও নদীনির্ভর জেলে পরিবার। তাই জরুরি খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
দুর্যোগে অসহায় হয়ে পড়া পরিবারগুলোর একটাই আকুতি—প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের বিত্তবান মানুষ যেন দ্রুত তাদের পাশে দাঁড়ান। কারণ, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি শুধু তাদের কর্মসংস্থানই বন্ধ করেনি, অনেক পরিবারের চুলার আগুনও নিভিয়ে দিয়েছে।
