বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বহাল তবিয়্যতে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত কর্মচারীরা!
নিজস্ব প্রতিবেদক : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশ উপেক্ষা করে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত কর্মচারীদের ফেরত না পাঠিয়ে বহাল রাখা হয়েছে। এমনকি বিধিমালা লঙ্ঘন করে পদোন্নতিও দেওয়া হয়েছে। যা নিয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। ইত্যোমধ্যে তারা বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করলেও কোন সুরাহা মেলেনি।
জানা গেছে- তৎকালিন সময় বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় স্থাপনের পর কার্যক্রম সচল রাখতে বিভিন্ন জেলা প্রশাসন থেকে বদলি/প্রেষণে কর্মচারীদের এনে এ অফিসে বসানো হয়। পাশাপাশি সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু চাকুরি বিধিমালা অনুযায়ী এক দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অন্য আদেশ ছাড়া বদলি/প্রেষণে নিয়োগ সুযোগ নেই। এ নিয়ে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় ওই সকল কর্মারীদের বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে একাধিকবার ফেরত পাঠানোর আদেশ দিলেও অদৃশ্য ক্ষমতা বলে তারা বহাল তবিয়্যতে রয়েছেন।
বহাল তবিয়্যতে থাকা কর্মচারীরা হলেন- ভোলা ডিসি অফিসের স্টাফ উপপ্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ রুহুল আমীন হাওলাদার, বরিশাল ডিসি অফিসের স্টাফ উপসহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা একেএম সরোয়ার হোসেন, ঝালকাঠি ডিসি অফিসের স্টাফ অফিস সহকারী মোঃ সরোয়ার হোসেন সরদার, ঝালকাঠি ডিসি অফিসের স্টাফ অফিস সহকারী আঃ রহমান হাওলাদার, ভোলা ডিসি অফিসের স্টাফ অফিস সহকারী ঝর্ণা রাণী মজুমদার, মাগুরা ডিসি অফিসের স্টাফ দপ্তরী মোঃ এনামুল হক দুলাল। এছাড়াও একাধিক কর্মচারী বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে কর্মরত আছেন। এদের মধ্যে একেএম সরোয়ার হোসেনকে বিধি বহির্ভূতভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
২০০৬ সালে ৩ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালযয়ের মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব আবদুল মান্নান স্বাক্ষরিত এক আদেশে বলা হয়েছে- সম্প্রতি লক্ষ্য করা গেছে যে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কর্মকর্তা/কর্মচারীকে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় এবং বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের কর্মকর্তা/কর্মচারীকে প্রশাসকের কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে বা হচ্ছে। এমনকি বদলির মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়েছে এ ধরনের কয়েকটি ঘটনাও মন্ত্রণালয়ের নজরে এসেছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, রাজস্ব খাতের প্রতিটি কার্যালয়ের নিজস্ব চাকুরি বিধিমালা রয়েছে। এ চাকুরি বিধিমালা : সংশ্লিষ্ট চাকুরি সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে কোন কার্যালয়ের কর্মকর্তা/কর্মচারীকে অন্য কার্যালয়ে বদলি বা প্রেষণে বদলির বিধান না থাকলে এক কার্যালয় হতে অন্য ২৯/০১/০৬ কার্যালয়ে বদলি/প্রেষণে নিয়োগ করা যায় না । নিয়োগ বিধিতে প্রেষণে নিয়োগের সুযোগ থাকলে কেবলমাত্র সংস্স্থ্য পদ মন্ত্রণালয়ই কোন কর্মকর্তা/কর্মচারীকে প্রেষণে নিয়োগ প্রদান করতে পারে। বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জন্য প্রযোজ্য যথাক্রমে “বিভাগীয় কমিশনার অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগবিধি, ১৯৮৬ এবং “জেলা এবং উপজেলা অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগবিধি, ১৯৮৬” এ পারস্পরিক বদলি, নিয়োগ বা পদোন্নতির সুযোগ রাখা হয়নি। উভয় নিযোগ বিধির নিযোগের পদ্ধতি হিসাবে পদোন্নতির মাধ্যমে এবং সরাসরি বিধি ও এ নিয়োগের মাধ্যমে নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগ এ ধরনের বদলির বিষয়ে নিম্নরুপ মতামত প্রদান করেছে।
নিম্ন মতামত প্রদান করেছে : “বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের চাকুরী দুটি ভিন্ন ভিন্ন নিয়োগবিধি দ্বারা পরিচালিত হয়। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের পরস্পর বদলি করার কোন বিধিগত সুযোগ নেই !”
উল্লিখিত ব্যাথা, মতামত ও বিশ্লেষণের আলোকে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের সদয় সার্থে ও কার্যার্থে জানানো যাচ্ছে যে, কার্যবলীগুলোর এর কার্যালয় থেকে জন্য কার্যালয়ে কোন কর্মকর্তা/কর্মচারীতে বদলি সেখানে পাঠানো কিংবা বদলীর মাধ্যমে নিয়োগ, বিধি এ রীতিবিরুদ্ধ। এতে বিভিন্ন প্রকার আর্থিক/প্রশাসনিক ও চাকুরি সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিবে; যার সমাধান বর্তমানে প্রচলিত চাকুরি বিধিতে সন্নিবেশিত নেই। এর ফলে মামলা মোকদ্দমার সৃষ্টি হতে পারে। ইতোপূর্বে কোন কার্যালয় এ রকমের কোন কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা/কর্মচারীদেরকে অবিলম্বে নিজ নিজ কার্যালয়ে ফেরত প্রদান করে সশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হল।
সকল বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসককে একটি ছকে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন প্রেরণের জন্যও অনুরোধ করা হয়েছিল।
এছাড়াও বেশ কয়েকবার মন্ত্রণালয় থেকে এ সকল কর্মকর্তা/কর্মচারীদের নিজ নিজ কার্যালয়ে ফেরত পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়েছিল।
এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে ২০২১ সালের ৬ জুলাই সাবেক বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার রিপন চাকমা স্বাক্ষরিত এক আদেশে বলা হয়েছিল – বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার অফিসে জেলা প্রশাসন থেকে প্রেষণে আসা কর্মচারীদের পূর্বের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরত প্রদান পূর্বক বিধি মোতাবেক বিভাগীয় কমিশনার অফিসের নিয়োগ বিধির আলোকে পদোন্নতি পাওয়ার আবেদন প্রেরণ।
উপর্যুক্ত বিষয় ও সূত্রোক্ত স্মারকের পরিপ্রেক্ষিতে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার অফিসে জেলা প্রশাসন থেকে প্রেষণে আসা কর্মচারীদের পূর্বের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরত প্রদানের আবেদনের বিষয়ে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের একাধিক কর্মচারী বলেন- মন্ত্রণালয়ের আদেশ উপেক্ষা করে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত কর্মচারীদের নিজ নিজ কর্মস্হলে ফেরত হচ্ছে না। মন্ত্রণালয় একাধিকবার আদেশ দিলেও তাদের ফেরত পাঠানো হয়নি। তারা চাকুরি বিধিমালা মানছে না। পদোন্নতি পাচ্ছে, এমনকি বিভাগীয় কমিশনার অফিসের সকল সুযোগ-সুবিধাও নিচ্ছে। আমরা পদোন্নতি পাচ্ছিনা। অন্য অফিস থেকে এসে তারা পদোন্নতি পাচ্ছে। আমরা দ্রুত তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরত পাঠানোর দাবি জানাই।
এ বিষয়ে একেএম সরোয়ার হোসেন বলেন- মন্ত্রণালয়ের আদেশের প্রেক্ষিতে আমাকে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে স্থায়ী বদলি করা হয়েছে। আর যদি বিধিমালায় পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ না থাকে তাহলে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কিভাবে আমাকে পদোন্নতি দিয়েছে, সেটা তাদের জিজ্ঞেস করেন। মন্ত্রণালয়ের যে আদেশে স্থায়ী বদলি করা হয়েছে সেটি আমার বস উপ প্রশাসনিক কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন গাজীর কাছে রয়েছে, আপনি তার সাথে কথা বলেন।
এ বিষয়ে জানতে উপ প্রশাসনিক কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন গাজীর মুঠোফোনে কল দিলে তিনি বলেন- ভাই (প্রতিবেদক) আপনি চাইলেই তো আর তথ্য দিয়ে দিতে পারি। আপনার তথ্য লাগলে আপনি তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেন। তবে এতটুকু বলতে পারি একেএম সরোয়ার হোসেন যেটা দাবি করেছেন সেটি সঠিক নয়। এর বেশি কিছু বলতে পারবো না।
এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (সংস্থাপন-২ শাখা) মাসুমা আক্তার বলেন- বিষয়টি খোঁজ নিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ বলেন- আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি জানা ছিল না। খোঁঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমার দপ্তরে কোন প্রকার অনিয়ম ছাড় দেওয়া হবে না।
