খবরে আর বাজারে তেলের দাম এক হয় না কেন?
অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে বলে খবর প্রকাশিত হলেও বাস্তবে ক্রেতাদের বেশি দামে তেল কিনতে হয়। কারণ, বাজারে যে ‘তেলের দাম’ প্রচারিত হয়, সেটি সব সময় বাস্তবে সরবরাহ হওয়া তেলের দাম নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্পট ও ফিউচারস বাজারের পার্থক্যের কারণেই এই ব্যবধান তৈরি হয়।
স্পট ও ফিউচারসের পার্থক্য তেলের দুটি প্রধান বাজার রয়েছে। একটি স্পট বাজার, যেখানে তাৎক্ষণিক সরবরাহের জন্য তেল কেনাবেচা হয়। অন্যটি ফিউচারস বাজার, যেখানে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময়ে সরবরাহের জন্য আগেই দাম নির্ধারণ করা হয়।
সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সময় এই পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফিউচারস বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম প্রায় ১০০ ডলারের আশপাশে থাকলেও বাস্তবে সরবরাহ হওয়া তেলের চালান অনেক ক্ষেত্রে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। ডিজেল ও জেট জ্বালানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়।
রাজনীতিবিদেরা অবশ্য ক্রমবর্ধমান জ্বালানি খরচ আড়াল করতে ফিউচার মার্কেটের কম দামকেই সামনে এনেছিলেন। তারা যুক্তি দিয়েছিলেন, দ্রুতই তেলের দাম কমে আসবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। কারণ ফিউচার প্রাইস কখনই বর্তমানের প্রকৃত দামের সঠিক নির্দেশক নয়।
কেন দুই বাজারের দাম আলাদা বিশেষজ্ঞদের মতে, তেল কোনো এক ধরনের পণ্য নয়। বিভিন্ন মানের অপরিশোধিত তেল রয়েছে এবং সেগুলো থেকে ভিন্ন ধরনের জ্বালানি উৎপাদিত হয়। এর পাশাপাশি সংরক্ষণ, পরিবহন, বিমা ও গুণগত মানের পরিবর্তনের মতো বিষয়ও দামের ওপর প্রভাব ফেলে।
ফিউচারস বাজারে অনেক বিনিয়োগকারী কেবল দামের ওঠানামা থেকে লাভ করতে চান। তারা বাস্তবে তেল গ্রহণ করেন না। অন্যদিকে উৎপাদক, পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের প্রকৃত তেল প্রয়োজন হয়।
কেইনসের ঐতিহাসিক ঘটনা জ্বালানি বা পণ্যের কাগজের দাম আর বাস্তবের জোগানের মধ্যে যে তফাৎ, তা বুঝতে ১৯৩৬ সালের একটি ঘটনা মনে করা যেতে পারে। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস একবার তার কলেজের তহবিল ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে ফরোয়ার্ড চুক্তিতে বিপুল পরিমাণ গম কিনেছিলেন।
দাম নিয়ে ফাটকাবাজি করতে গিয়ে তিনি বিপাকে পড়েন। চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী এক মাসের পুরো গম সশরীরে বুঝে নিতে তিনি বাধ্য হন। সেই গম রাখার জায়গা কেমব্রিজের কিং’স কলেজ চ্যাপেলের ক্রিপ্টেও ছিল না। পরে মান নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে খালাস প্রক্রিয়া বিলম্বিত করে তিনি কোনোমতে সে যাত্রা রক্ষা পান।
যুদ্ধের সময় কেন বাড়ে বাস্তব তেলের দাম যুদ্ধ বা সরবরাহ সংকটের সময় বাজারে তাৎক্ষণিক তেলের চাহিদা বেড়ে যায়। তখন হাতে থাকা তেলের মূল্য বা ‘কনভিনিয়েন্স ইয়িল্ড’ বৃদ্ধি পায়। ফলে স্পট বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে, যদিও ফিউচারস বাজারে একই হারে পরিবর্তন না-ও দেখা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এ অবস্থাকে অনেক সময় ‘ব্যাকওয়ার্ডেশন’ বলা হয়। অর্থাৎ ভবিষ্যতের তুলনায় বর্তমান সরবরাহের তেলের দাম বেশি থাকে।
২০২০ সালের ঘটনা বাস্তব পণ্য হাতে পাওয়ার ভয় কতটা তীব্র হতে পারে, তা ২০২০ সালের এপ্রিলে দেখা গিয়েছিল। করোনাকালে বিশ্বজুড়ে তেলের অতিরিক্ত জোগান এবং মজুত রাখার জায়গার অভাবে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম মাইনাস ৩৭ দশমিক ৬৩ ডলারে নেমে গিয়েছিল। অর্থাৎ, তেল নিজেদের কাছে রাখার ঝামেলা এড়াতে বিক্রেতারাই উল্টো ক্রেতাদের টাকা দিতে রাজি ছিলেন।
এই পরিস্থিতিকে ‘কনট্যাঙ্গো’ বলা হয়। তখন ভবিষ্যতের তেলের দাম বর্তমান দামের চেয়ে বেশি থাকে।
কেন শুধু ফিউচারসের দাম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয় অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ফিউচারসের দাম বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও সেটি সব সময় বাস্তব সরবরাহ পরিস্থিতি প্রতিফলিত করে না। বিশেষ করে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক সংকট বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে প্রকৃত তেলের প্রাপ্যতা ও পরিবহন ব্যয় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ঘোষিত তেলের দাম কম হলেও বাস্তবে অনেক সময় আমদানিকারক বা ভোক্তাদের বেশি দাম গুনতে হয়। উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সহজ নয়
বর্তমানে বিশ্বে অতিরিক্ত তেল উৎপাদনের সক্ষমতা সীমিত। সৌদি আরব, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় উৎপাদক দেশগুলোরও উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
এ ছাড়া বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের কারণে নতুন তেলক্ষেত্রে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় সরবরাহ দ্রুত বাড়ানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ বা চরম অনিশ্চয়তার সময়ে বাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তেলের প্রাপ্যতা। তখন ফিউচারসের দামের চেয়ে বাস্তবে কোথায়, কত তেল পাওয়া যাচ্ছে এবং কত দ্রুত সরবরাহ করা সম্ভব—এসব বিষয়ই বাজারে বেশি প্রভাব ফেলে। তাই তেলের দাম বোঝার ক্ষেত্রে শুধু ফিউচারস বাজার নয়, স্পট বাজারের পরিস্থিতিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
