পটুয়াখালীতে সরকারি বেয়ারাকে দিয়ে ঘরের কাজ, কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২২:৪৭, জুন ২৯ ২০২৬ মিনিট

 বেয়ারাকে দিয়ে সরকারি দায়িত্বের বাইরে বাসায় নিয়ে গৃহস্থালির কাজ করানো, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কাজ করতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে পটুয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মোহাম্মদ তারেক হাওলাদারের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সংস্থাপন শাখার বেয়ারা পদে কর্মরত আল মামুন রিয়াদ।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীকে। তবে অভিযোগকারীকে অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য বিভিন্নভাবে চাপ ও অন্যত্র বদলির হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে গত ২৭ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন আল মামুন। পরে ১৮ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-৪ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব আখিনুর বেগম প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগে চিঠি পাঠান। এরপর ১৫ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ সাহেদুল ইসলামের সই করা চিঠিতে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারকে তদন্ত করে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

এর ধারাবাহিকতায় ১৭ জুন বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার মারযুক রহমানের সই করা পত্রে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসককে বিস্তারিত তদন্ত করে সাত কার্যদিবসের মধ্যে সুস্পষ্ট মতামত দিতে বলা হয়। পরে ২২ জুন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী অভিযোগকারী আল মামুন রিয়াদ ও অভিযুক্ত এডিএম মোহাম্মদ তারেক হাওলাদারকে তদন্ত শুনানিতে উপস্থিত থাকার জন্য নোটিশ দেন।

জেলা প্রশাসকের নোটিশ অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ৩টায় তদন্ত শুনানি হওয়ার কথা ছিল। পরে বিকেল ৫টায় শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। জানা যায়, সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তদন্ত কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর অভিযোগকারী জেলা প্রশাসকের কক্ষ থেকে বের হয়ে গেলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা সেখানে ঢোকেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে দেওয়া অভিযোগে আল মামুন উল্লেখ করেন, তিনি ২০২৩ সালের ২১ জুন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের বেয়ারার পদে যোগ দেন। ২০২৫ সালের মার্চে অসুস্থ হয়ে পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঢাকায় চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি ভারী কাজ করার সক্ষমতা হারান। এরপরও তাঁকে সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যক্তিগত বিভিন্ন কাজ করতে বাধ্য করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, আল মামুনকে দিয়ে মোহাম্মদ তারেক হাওলাদার নিজের বাসার ঘর ঝাড়ু দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কাপড় ধোয়া ও শুকানো, হাঁস-মুরগির দেখাশোনা এবং তাঁর দুই সন্তানকে স্কুলে আনা-নেওয়াসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত কাজ করাতেন। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবারও তাঁকে কাজে যেতে বাধ্য করা হতো।

আল মামুনের অভিযোগ, গত ২৪ এপ্রিল তাঁর দাদি মারা যান। পরদিন ২৫ এপ্রিল সকালে পরিবারের সদস্যরা জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ওই সময় এডিএম তারেক হাওলাদার তাঁকে ফোন করে দ্রুত বাসায় যেতে নির্দেশ দেন। আল মামুনকে বিভিন্নভাবে কাজে যেতে বলা হলেও তিনি পরিবারের প্রয়োজনে মরদেহ রেখে সেদিন যেতে পারেননি।

আল মামুন রিয়াদের ভাষ্য, ‘সরকারি দায়িত্বের বাইরে এডিএম তাঁর বাসার প্রায় সব ব্যক্তিগত কাজ করিয়েছেন। নিজের পরিবার ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য ছুটি চাইলেও তা দেওয়া হয়নি। শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও গত এক বছর দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে। কাজে যেতে অপারগতা প্রকাশ করলে আপত্তিকর আচরণ এবং অন্যত্র বদলির হুমকি দেওয়া হতো। ২৬ এপ্রিল অফিসে গেলে সরকারি দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ তুলে সহকারী কমিশনার তামিম নূর ইসলাম তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। পরে তিনি নোটিশ গ্রহণ না করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন।

এ ছাড়া আল মামুন রিয়াদের ভাষ্য, অভিযোগটি জানাজানি হওয়ার পর নেজারত শাখার সহকারী নাজির সাব্বির হোসেন তাঁকে ভয়ভীতি দেখিয়ে এডিএমের কাছে ক্ষমা চেয়ে অভিযোগ প্রত্যাহার করতে চাপ দেন। তবে সাব্বির হোসেন অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘অভিযোগটি এখন আমাদের পর্যায়ে নেই। এ বিষয়ে সাক্ষাতে কথা বলতে হবে।’

এ বিষয়ে অভিযুক্ত অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ তারেক হাওলাদারের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে আমার কাছে মতামত চাওয়া হয়েছে। আমি তদন্ত করে মতামত দেব। তবে তদন্তাধীন বিষয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই।’

একই কথা জানিয়েছেন বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ। তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মতামত দেওয়া যাবে।