এবার অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন দুয়ার খুলছে বরিশাল ইপিজেড

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২১:৫৫, জুন ২৯ ২০২৬ মিনিট

নিজস্ব প্রতিবেদক : এবার অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন দুয়ার খুলতে যাচ্ছে। বরিশালে একটি পূর্ণাঙ্গ ইপিজেড (রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল) এলাকা গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বরিশালই হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক হাব।

জানা যায়, নদীপথের সহজ যোগাযোগ আর অপার সম্ভাবনা থাকলেও, বছরের পর বছর শিল্পাঞ্চল না থাকায় চরম অর্থনৈতিক খরায় ভুগছে দেশের দক্ষিণাঞ্চল।

কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতিবছরই নিজ জেলা ছাড়ছেন হাজারো তরুণ-তরুণী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী, কর্মসংস্থানের অভাবে বরিশালের স্থানীয় প্রায় ১৯ শতাংশ মানুষই রাজধানীতে স্থানান্তরিত হয়েছেন, যার সিংহভাগই তরুণ ও কর্মক্ষম।

প্রকৃতির সবটুকু আশীর্বাদ, সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা আর ফাঁকা বিশালাকার জমি থাকা সত্ত্বেও বরিশাল এতদিন পিছিয়ে ছিল শুধু শিল্পাঞ্চলের অভাবে। তবে প্রধানমন্ত্র‍ীর এই ইপিজেড নির্মাণের ঘোষণায় এবার ভাগ্য বদলাতে যাচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বসিত বরিশালের তরুণ সমাজ, যাদের একটা বড় অংশই পড়াশোনা শেষ করেই কাজের সন্ধানে নিজ জেলা ছেড়ে ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

​সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমাদের বড় ভাইদের দেখেছি পড়াশোনা শেষ করে চাতক পাখির মতো ঢাকার দিকে চেয়ে থাকতে। বরিশালে কোনো বড় শিল্পকারখানা না থাকায় বাধ্য হয়েই নিজ জেলা ছাড়তে হতো। বরিশালে ইপিজেড হলে আমাদের মতো হাজারো শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থান নিজের ঘরেই হবে। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।’

সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলেন, ‘নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনা শেষে চাকরি খুঁজতে ঢাকা বা অন্য কোনো বড় শহরে যাওয়াটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল। অনেক পরিবারই মেয়েদের একা বাইরে পাঠাতে চায় না। বরিশালে রফতানি প্রক্র‍িয়া জোন হলে নারীদের জন্য বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।’

​একই কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মাহিন আহমেদ বলেন, ‘ইপিজেড হলে শুধু কলকারখানা নয়, এর আশপাশে আবাসন, পরিবহন ও সেবামূলক খাতেরও বিকাশ ঘটবে। মহাপরিকল্পনাটি যেন দ্রুত কাগজের কলম থেকে বাস্তবে রূপ নেয়।’

স্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলেন, ‘এটি কেবল আশ্বাসের বাণী নয়। এই মহাপরিকল্পনা সফল করতে জমি অধিগ্রহণ, গ্যাস সরবরাহ এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ এবং কাছাকাছি দূরত্বের পায়রা সমুদ্রবন্দর পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় সুবিধা দেবে। এর ফলে নিজ জেলাতেই কর্মসংস্থান পাবেন লাখো মানুষ।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), বরিশালের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, ‘বরিশালে ইপিজেড প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সময়োপযোগী। তবে শুধু ঘোষণা দিলেই হবে না, এর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প এলাকায় সুশাসন ও স্বচ্ছতা বজায় রেখে দ্রুত জমি অধিগ্রহণ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন করা জরুরি, যাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রকল্পটি দীর্ঘায়িত না হয়।’

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আকতারুজ্জামান খান এই উদ্যোগের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘পায়রা সমুদ্রবন্দরের নিকটবর্তী ভৌগোলিক অবস্থান বরিশালের জন্য একটি বিরাট প্লাস পয়েন্ট। ইপিজেড চালু হলে এখানে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে। ঢাকার সঙ্গে উন্নত সড়ক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে খুব কম খরচে পণ্য আনা-নেয়া সম্ভব হবে, যা এই অঞ্চলের জিডিপি বৃদ্ধিতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখবে।’

​দি বরিশাল চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এবায়েদুল হক চাঁন বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা সবসময় বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ খোঁজেন। বরিশালে পর্যাপ্ত জমি ও নদীপথের সুবিধা রয়েছে। এখন সরকার যদি ভোলার গ্যাস দ্রুত সরবরাহ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পারে, তবে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপগুলোর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখানে হুমড়ি খেয়ে পড়বেন। এটি হবে দক্ষিণাঞ্চলের বাণিজ্যিক বিপ্লব।’

​বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো. আহসান হাবিব বলেন, ‘বরিশালে রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল স্থাপনে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক। শিগগিরই প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখবে এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধারণ মানুষ দেখতে পাবে।’