বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেলে নবজাতকের মৃ’ত্যুকে কেন্দ্র করে তুলকালাম

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২১:০৯, মে ২০ ২০২৬ মিনিট

নিজস্ব প্রতিবেদক : নবজাতক শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের সঙ্গে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের তুলকালাম ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, শিশুর ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে স্বজনরা নারী শিক্ষার্থী-নার্সদের হেনস্থা করেছে। তাই শিশুর এক স্বজনসহ দুজনকে মারধর করে আটকে রাখে তারা। তবে শিশুর স্বজনদের অভিযোগ আবেগআপ্লুত হয়ে বাতবিতণ্ডা হলেও কাউকে হেনস্থা করেননি তারা। পরে হাসপাতাল পরিচালক, মেডিকেল কলেজ প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ক্ষমা চেয়ে-মুচলেকা দিলে আটক দুজনকে ছেড়ে দেয় শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার রাতে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে এসব ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার অলক কান্তি শর্মা মারা যাওয়া ৭ দিনের শিশুটি বানারীপাড়া উপজেলার চাখারের বাসিন্দা উজ্জল দের মেয়ে। জন্মের পরপরই অসুস্থ হওয়ায় বৃহস্পতিবার তাকে শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। এখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শিশুটির মৃত্যু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, শিশুটির মৃত্যুর পরপরই স্বজনরা আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ তুলেন। যা নিয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে স্বজনদের বাকবিতণ্ডাও হয়। এর কিছুক্ষণ পরে কয়েকজন এসে শিশুটির মামা জয়দেবকে মারধর করে, মামুন নামে আরেক যুবক সেই ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে মারধরের শিকার হন। পরে তাদের হাসপাতালের নীচতলার জরুরি বিভাগের একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। যদিও মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা। এই বর্ষের শিক্ষার্থী শান্ত তালুকদার বলেন, “সকালে ও বিকালে আমাদের ওয়ার্ড থাকে এবং এর ওপর আইটেম থাকে। আইটেম দিয়ে বের হওয়ার সময় মৃত শিশুর বাবা তার স্বজনদের আমাদের আটকে রাখতে বলেন। তার অভিযোগ ভুল চিকিৎসার জন্য তার সন্তানটি মৃত্যুবরণ করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, “মৃতের স্বজনরা আমাদের আটকানোর চেষ্টাকালে মেয়ে শিক্ষার্থীদের এপ্রোন ও ব্যাগ ধরে টান দেন। সেইসাথে ওয়ার্ডের দায়িত্বরত নার্সদেরও হেনস্থা করেন।” অপর শিক্ষার্থী মুনয়াত মুন বলেন, “নবজাতক ওয়ার্ডের পাশে আমাদের ক্লাশ রুম, যেখান থেকে বের হওয়ার সময় হট্টগোলের বিষয়টি শুনতে পাচ্ছিলাম। তবে সেখান থেকে যাওয়ার সময় একটা লোক আমাদের কারও হাত এবং কারও ওড়না, আবার কারও ব্যাগ ধরে টান দেন এবং অশোভন আচরণ শুরু করেন। আমরা আত্মরক্ষার্থে সেবিকাদের সহায়তায় একটা রুমে আশ্রয় নেই, এরপর দুই ছেলে ব্যাচমেট এসে তাকে নিবৃত করার চেষ্টা করে। কিন্তু সে তাদেরও মোবাইল ভাঙচুর করে, পরে ইউনিফর্ম লুকিয়ে আমরা সেখান থেকে পালিয়ে আসি।” তবে শিশুর বাবা উজ্জল বলেন, সন্ধ্যার পরে তার সন্তানের শ্বাসকষ্ট হওয়ায় চিকিৎসকের কাছে যান তারা। ওইসময় রুমে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ছিল, তারা এসে শিশুকে মৃত ঘোষণা করলে, তার মামা আবেগআপ্লুত হয়ে পড়ে। তিনি ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওয়ার্ড থেকে যেতে নিষেধ করলে তাকে এবং অপর আরেক ব্যক্তিকে মারধর করে নিয়ে যায়। মৃত শিশুর মা পূজা রানী দাস বলেন, “সন্তানের মৃত্যুর পর আমার ভাই হয়তো মুখে কিছু বলেছে কিন্তু কারও গায়ে হাত দেয়নি। তারপরও তাকে শিক্ষার্থীরা মারতে মারতে নীচে নিয়ে গেছে। যদি আমার ভাই কোনো ভুল করে থাকে তাহলে আমি হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছি, আমাদের মাফ করে দেন। সন্ধ্যায় ৬ টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত এখানে মৃত সন্তানকে নিয়ে বসে আছি, আমাদের যেতে দিন।” এদিকে শিক্ষার্থীরা শিশুটির মামাসহ দুজনকে আটকে রাখার খবরে হাসপাতাল পরিচালক ও কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা আটক দুজনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। সেইসাথে এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনের বাস্তবায়ন চান। এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার অলক কান্তি শর্মা বলেন, “ছাত্র আর রোগীর স্বজনদের মধ্যে কথা কাটাকাটির সূত্র ধরে অপ্রত্যাশিত একটি ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ যাদের কাছ থেকে পাবো, তার সূত্র ধরেই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ. কে. এম. মশিউল মুনীর বলেন, “বিষয়টি উভয়পক্ষের সঙ্গে বসে সমাধান করা হয়েছে। আমরা চাই এখানে যারা পড়ালেখা করছে তারা যেন স্বাভাবিকভাবে ইউনিফর্ম পড়ে ক্যাম্পাসে চলাফেরা করতে পারে, সেইসাথে রোগীদেরও যেন ঠিকভাবে চিকিৎসা হয়। তিনি বলেন, “সমস্যা আমাদের অনেক রয়েছে, ধীরে ধীরে সমাধান করতে হবে এবং ধৈর্য্য ধরতে হবে।”