বরিশালে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিবাহবিচ্ছেদ

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২৩:০৭, মে ১৩ ২০২৬ মিনিট

বরিশালে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিবাহবিচ্ছেদ। জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শহরে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৯টি করে তালাক বা ডিভোর্স আবেদন জমা পড়ছে। গত তিন বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নিবন্ধিত বিয়ের তুলনায় বিচ্ছেদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশেষ করে নারীরা তালাকের আবেদনকারীদের মধ্যে এগিয়ে রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মোট ৩২ হাজার ১৩টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। একই সময়ে বিচ্ছেদ হয়েছে ১০ হাজার ৭৩৮টি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৬৬৬টি বিয়ের মধ্যে ৩ হাজার ৫টি বিচ্ছেদ ঘটে। ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৯৭৮টি বিয়ের বিপরীতে ৩ হাজার ৩৪৭টি সংসার ভেঙে যায়। আর ২০২৫ সালে ১৩ হাজার ৩৬৯টি বিয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়েছে ৪ হাজার ৩৮৬টি। এই পরিসংখ্যান বরিশালের সামাজিক বাস্তবতায় একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়া, মানসিক দূরত্ব বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপ বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আসছে। বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকায় সম্প্রতি এক ব্যবসায়ী পারিবারিক কলহের জেরে কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এ ধরনের ঘটনা দাম্পত্য জীবনের মানসিক চাপকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। এ ছাড়া যৌতুক দাবি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, পরকীয়া এবং অনলাইন জুয়া ও মাদকের আসক্তিও বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। অনেক নারী অভিযোগ করেছেন, স্বামীর বেকারত্ব ও মাদকাসক্তি তাদের সংসার ভাঙনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে স্ত্রীর গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণেও স্বামীর পক্ষ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘটনা ঘটছে। সমাজে আরেকটি নতুন প্রবণতা হিসেবে দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রেম-বিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্তে বিয়ে হলেও বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও বোঝাপড়ার অভাবে তা টিকছে না। ফলে অল্প সময়েই সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে। বরিশাল নগরীর কাশিপুর এলাকার এক ঘটনাও সামাজিক আলোচনায় এসেছে, যেখানে পারিবারিক বিরোধ ও আর্থিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে একটি নবদম্পতির সম্পর্ক ভেঙে যায়। একইভাবে নগরীর ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে এক তরুণীর ক্ষেত্রে স্বামীর পরিবারে আর্থিক চাপ ও অসুস্থতার কারণে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং গোপনে তালাক দেওয়া হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বরিশাল শাখার সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা বলেন, বিবাহ এখন অনেক ক্ষেত্রে শুধু আইনি ও আর্থিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পারস্পরিক বোঝাপড়া ও মূল্যবোধের অভাবে সংসার ভাঙছে, যার প্রভাব পড়ছে সন্তান ও সমাজে। তিনি আরও বলেন, অনেকেই বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত না হয়ে সংসারে প্রবেশ করছেন, ফলে ছোটখাটো সমস্যাও বড় সংকটে রূপ নিচ্ছে। বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার মো: মোহছেন মিয়া বলেন, সাম্প্রতিক তিন বছরের বিশ্লেষণে দেখা গেছে তালাকের আবেদনকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ২০২৬ সালে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।