মেহেন্দিগঞ্জে ডা. সোলায়মানকে বাঁচাতে মরিয়া প্রশাসন, ভুক্তভোগীকে শাস্তি দিয়ে অপরাধীকে রক্ষার চেষ্টা

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২৩:০৯, মে ০৯ ২০২৬ মিনিট

বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ এখন এক অন্ধকার জনপদে পরিণত হয়েছে যেখানে ন্যায়বিচার গুমরে কাঁদছে আর অপরাধীরা প্রশাসনের আশ্রয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এই দপ্তরের বিতর্কিত মেডিকেল অফিসার ডা. এ বি এম সোলায়মান মাসুমের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন হয়রানি ও দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ ধামাচাপা দিতে খোদ প্রশাসনই এখন ‘রক্ষক’ হিসেবে মাঠে নেমেছে। ভুক্তভোগী পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা উম্মে হাবিবা ছন্দাকে মিথ্যা অভিযোগে দ- প্রদান এবং ডা. সোলায়মানের চরম কুরুচিপূর্ণ অডিও ফাঁসের পর গোটা বরিশালজুড়ে বইছে ক্ষোভের আগুন। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া ওই অডিও রেকর্ডে ডা. সোলায়মানকে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ভাষায় সাংবাদিকদের গালিগালাজ করতে শোনা যায় যেখানে তিনি সাংবাদিক সমাজকে ‘জারজ’ বলে সম্বোধন করেন। এখানেই শেষ নয়, দপ্তরে কর্মরত নারী সহকর্মীদের ব্যক্তিগত জীবন ও চরিত্র নিয়ে অত্যন্ত নোংরা মন্তব্য করার পাশাপাশি তিনি দম্ভোক্তি করেন যে, তার কিছুই হবে না এবং বাবার ক্ষমতা ও টাকা দিয়ে তিনি সবকিছু কিনে নেবেন। একজন সরকারি কর্মকর্তার মুখে এমন অশোভন ভাষা প্রশাসনের নৈতিক পতনকেই স্পষ্ট করে তুলছে। অভিযোগ উঠেছে যে, তদন্ত কমিটির প্রধান এডি সি.সি ডা. শামসুজ্জামান নিরপেক্ষ তদন্তের পরিবর্তে ডা. সোলায়মানের সাথে গোপনে বৈঠক করেছেন এবং তাকে ক্লিনচিট দেওয়ার এক নীল নকশা তৈরি করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৩ এপ্রিল বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এক আদেশে ভুক্তভোগী ছন্দাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয় পটুয়াখালীতে অথচ মূল অপরাধী ডা. সোলায়মান মাসুম বহাল তবিয়তে মেহেন্দিগঞ্জেই অবস্থান করছেন। এদিকে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (ডিডি) মেহেবুব মোর্শেদ এই অন্যায়ের ঢাল হিসেবে কাজ করছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীর ইনক্রিমেন্ট স্থগিত এবং অন্যায় বদলির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সাথে বলেন যে, ভুক্তভোগী চাইলে আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন এবং আদেশের কারণ আদেশেই লেখা আছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডা. সোলায়মানের বাবা এনবিআরের সাবেক কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং সাবেক এমপি পঙ্কজ দেবনাথের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় নিজেকে ‘ছায়া ডিডি’ পরিচয় দিয়ে গোটা দপ্তরকে জিম্মি করে রেখেছেন। তদন্ত কমিটির প্রধান ডা. সিরাজ আহম্মেদ অডিও রেকর্ড প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন যা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। এই নজিরবিহীন অন্যায়ের বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বরিশালের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য বলেন, “একজন সরকারি কর্মকর্তার কণ্ঠে সাংবাদিক ও নারী সহকর্মীদের প্রতি এমন কুরুচিপূর্ণ ভাষা ও দম্ভোক্তি কেবল শিষ্টাচার বহির্ভূত নয় বরং এটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। প্রশাসন যখন অপরাধীকে আড়াল করতে ভুক্তভোগীকে শাস্তি দেয়, তখন সাধারণ মানুষের বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা উঠে যায়। আমরা এই সাজানো তদন্ত প্রত্যাখ্যান করছি এবং অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।” সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, দ্রুত সময়ের মধ্যে ডা. সোলায়মান মাসুমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীর ওপর থেকে অন্যায় দ- প্রত্যাহার করা না হলে তারা রাজপথে কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন। প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কীভাবে গোটা নারী সমাজ ও সাংবাদিক সমাজকে অপমান করার দুঃসাহস পায়, এখন সেই প্রশ্নই সর্বত্র ঘুরপাক খাচ্ছে।