নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ একাধিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদ থেকে পদাবনতি পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তা বসির নকতি আবারও বরিশাল কোতোয়ালী মডেল থানায় যোগদান করায় জনমনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তিন বছর আগে যেসব অভিযোগের তদন্তে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সেই একই থানায় পুনরায় তাকে দায়িত্ব দেওয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। তাদের আশঙ্কা, অভিযোগকারীদের ওপর প্রভাব খাটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জানা গেছে, ভোলা জেলার বাসিন্দা বসির নকতি দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছরের চাকরি জীবনের অধিকাংশ সময় বরিশালে কর্মরত ছিলেন। এই সময়ে তিনি বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তার বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও বারবার বরিশালেই দায়িত্ব পাওয়া রহস্যজনক।
সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ১৯ এপ্রিল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নে দলিল লেখক রিয়াজ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় লাশ উদ্ধারে গিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে বসির নকতির বিরুদ্ধে। এছাড়া করোনাকালীন সময়ে ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয়ে অভিযান পরিচালনা, মাছ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে মোট ১৭টি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।
ওই অভিযোগগুলোর তদন্ত করেন তৎকালীন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার রেজাউল করিম। তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়ায় ২০২২ সালে বসির নকতিকে এসআই পদ থেকে পদাবনতি দিয়ে এএসআই করা হয়। শাস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পুনরায় তিনি এসআই পদ ফিরে পান এবং আবারও কোতোয়ালী মডেল থানায় যোগদান করেন।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, অতীতেও একাধিকবার শাস্তিমূলক বদলির পর বসির পুনরায় বরিশালে ফিরে এসেছেন। এবার গুরুতর অভিযোগে পদাবনতির পরও একই থানায় তার পুনর্বহাল সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, যেসব ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে বসির শাস্তি পেয়েছিলেন, পুনরায় একই থানায় কর্মরত থাকায় তাদের ওপর চাপ বা প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত তাকে অন্যত্র বদলির দাবি জানান তারা।
একাধিক সূত্রে জানা যায়, গত বছরের জুন মাসে পুনরায় কোতোয়ালী থানায় যোগদানের পরপরই ১০ জুলাই কলেজ অ্যাভিনিউ এলাকার এক ফার্মেসি ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে করা অভিযোগ তদন্তে যান বসির নকতি। কাউনিয়া এলাকার সাথি নামের এক নারীর অভিযোগের ভিত্তিতে ওই ব্যবসায়ীকে থানায় নিয়ে আসা হয়। পরে ঘটনাটি দুই লাখ টাকায় মীমাংসা হলেও অভিযোগ রয়েছে, ভুক্তভোগী নারীকে এক লাখ টাকা দিয়ে বাকি এক লাখ টাকা নিজেই আত্মসাৎ করেন বসির।
বসির নকতির সম্পদের বিষয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরিশাল নগরীর জিয়া সড়কে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছেন তিনি। এছাড়া গোরস্থান রোড এলাকায় কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে যৌথভাবে নির্মিত একটি আধুনিক ভবনে তার ফ্ল্যাট ও জমির মালিকানা রয়েছে বলেও জানা যায়। নগরীতে আরও একাধিক প্লটের পাশাপাশি গ্রামের বাড়িতেও বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে বসির নকতি কোনো স্পষ্ট জবাব না দিয়ে সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে বিভিন্নভাবে তদবির চালানোর চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
নগরীর জিয়া সড়কের বাসিন্দা মামুন আকন বলেন, “কনস্টেবল থেকে এসআই এবং পরে শাস্তিস্বরূপ এএসআই হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সময় বরিশালে চাকরি করে বসির বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়েছে। তার মতো কর্মকর্তাদের কারণেই পুরো পুলিশ বাহিনী নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল কোতোয়ালী মডেল থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার অলক চন্দ্র বলেন, “আগের বিষয়গুলো আমার জানা নেই। তবে বর্তমানে তার বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অপরদিকে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার সুশান্ত কুমার পাল বলেন, “কার কোথায় যোগদান বা বদলি হবে, সেটি উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”