পায়রা বন্দরে অনিয়ম; দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে

নিজেস্ব প্রতিবেদক | ২১:৪০, মার্চ ১২ ২০২৬ মিনিট

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারে সমুদ্রবন্দরগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন ও নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত পায়রা বন্দরকে ঘিরে রাষ্ট্রের বড় প্রত্যাশা রয়েছে। এটি শুধু একটি বন্দর নয়, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, জাতীয় এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প এখন দুর্নীতি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। প্রায় ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি মোবাইল হারবার ক্রেন (এমএইচসি) ক্রয়ের প্রক্রিয়ায় যে জালিয়াতির অভিযোগ সামনে এসেছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়া সাধারণত স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্যই তৈরি করা হয়। কিন্তু পায়রা বন্দরের এই প্রকল্পে দরপত্রের কঠোর শর্ত থাকা সত্ত্বেও একটি অভিজ্ঞতাহীন কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচিত চীনা কোম্পানির ক্ষেত্রে কোনো শর্ত যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। এমনকি তাদের ওয়েবসাইটেও বিশ্বজুড়ে মোবাইল হারবার ক্রেন সরবরাহের সুস্পষ্ট রেকর্ড পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। যদি এ অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি নিছক প্রশাসনিক ভুল নয়। বরং একটি সুপরিকল্পিত অনিয়মের ইঙ্গিত বহন করে। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে এমন দায়িত্বহীনতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বিশ্বখ্যাত এবং অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন এই দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি? মোবাইল হারবার ক্রেন উৎপাদনে ইতালি, জার্মানি বা চীনের একাধিক প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক সুনাম রয়েছে। অথচ অভিযোগ রয়েছে, অখ্যাত একটি কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত রাখা হয়েছে। যদি সত্যিই এমনটি ঘটে থাকে, তবে তা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থার মৌলিক নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রায় ৪২ কোটি টাকার এই ক্রেন যদি ভবিষ্যতে নি¤œমানের বা অকার্যকর প্রমাণিত হয়, তবে তার প্রভাব শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। একটি বন্দরের কার্যক্রম নির্ভর করে তার সরঞ্জামের দক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর। বন্দরের মূল কাজ হলোÑ দ্রুত ও নিরাপদভাবে পণ্য ওঠানামা নিশ্চিত করা। কিন্তু ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি যদি বারবার বিকল হয় বা প্রত্যাশিত সক্ষমতা না থাকে, তবে বন্দরের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর পাশাপাশি প্রায় ১৫৮ কোটি টাকার দুটি শিপ-টু-শোর ক্রেন ক্রয় চুক্তি নিয়েও যে প্রশ্ন উঠেছে, তা বিষয়টিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। এত বড় অঙ্কের ক্রয়প্রক্রিয়া যদি যথাযথ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া সম্পন্ন হয়, তবে তা রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর বড় ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি করে। সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি প্রশাসনিক নৈতিকতাকেও দুর্বল করে দেয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এসব প্রকল্প যদি দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে উন্নয়নের অর্জনও ম্লান হয়ে যায়। পায়রা বন্দরের মতো কৌশলগত প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ দেশের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যারা এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, প্রভাবশালী কর্মকর্তা হোক বা অন্য কোনো পক্ষ, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার যে কঠোর অবস্থানের কথা বলে আসছে, এই ঘটনাটি সেই অবস্থানের বাস্তব পরীক্ষা। দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে শুধু পায়রা বন্দর নয়, রাষ্ট্রীয় সব প্রকল্পেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি শক্তিশালী হবে। রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের অর্থ। সেই অর্থের অপচয় কিংবা আত্মসাতের সুযোগ কেউ পাবে না, এই বার্তা স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। পায়রা বন্দরের এই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের কঠোর শাস্তিই পারে জনআস্থা পুনরুদ্ধার করতে এবং ভবিষ্যতে এমন অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে।