বাকেরগঞ্জে বিতর্কিত জাতীয় পার্টি নেতার বিএনপিতে অনুপ্রবেশ
নিজেস্ব প্রতিবেদক|১০:০০, ফেব্রুয়ারি ০৯ ২০২৬ মিনিট
তৃণমূলে বিদ্রোহের আগুন
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ নির্বাচন ঘিরে উত্তাপ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই বরিশালের বাকেরগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টির এক বিতর্কিত নেতার বিএনপিতে যোগদানকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা।
ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মতামত উপেক্ষা করে আলোচিত এই ব্যক্তিকে দলে অন্তর্ভুক্ত করায় দাঁড়িয়াল ইউনিয়নের তৃণমূল বিএনপির ভেতরে ক্ষোভ, হতাশা ও অবিশ্বাস দানা বেঁধেছে। অনেক নেতাকর্মীই এই ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’ এবং ‘অর্থের বিনিময়ে দলে অনুপ্রবেশ’ বলে অভিহিত করছেন। গত শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) বাকেরগঞ্জ উপজেলার দাঁড়িয়াল ইউনিয়নে এই আলোচিত ও বিতর্কিত যোগদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এর উদ্যোক্তা ছিলেন বরিশাল-৬ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবুল হোসেন খান।
বিএনপিতে যোগ দেওয়া ব্যক্তি হলেন জাতীয় পার্টির বাকেরগঞ্জ উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক বসির আহমেদ সবুজ। যিনি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বসির আহমেদ সবুজ। রাজনৈতিক পালাবদলের সম্ভাবনা দেখে তিনি এখন নিজেকে রক্ষা করতেই বিএনপিতে ঢোকার চেষ্টা করেছেন বলে দাবি করেন তারা। গত শনিবার বিকেলে দাঁড়িয়াল ইউনিয়নের কামারখালি কলেজ মাঠে বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই যোগদান অনুষ্ঠিত হয়। মঞ্চে উপস্থিত থেকে বিএনপি প্রার্থী আবুল হোসেন খান নিজ হাতে বসির আহমেদ সবুজকে ধানের শীষের প্রতীকী ফুল তুলে দেন। তবে এই দৃশ্য উপস্থিত অনেক স্থানীয় বিএনপি কর্মী ও সমর্থকের মধ্যে স্বস্তির পরিবর্তে ক্ষোভের জন্ম দেয়। কেউ কেউ মঞ্চের নিচে দাঁড়িয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বলেও জানা গেছে।
দাঁড়িয়াল ইউনিয়নের কাজলা-কাঠি গ্রামের বাসিন্দা মোস্তাফিজ হাওলাদার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “গত ১৭ বছর ধরে দাঁড়িয়াল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদ হাওলাদার ও এই বসির আহমেদ সবুজ একসঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। তিনি বিএনপি কর্মীদের নামের তালিকা তৈরি করে রাজনৈতিক মামলায় জড়ানোর ব্যবস্থা করেছেন। আজ সেই ব্যক্তিই যদি বিএনপির সদস্য হয়, তাহলে দলের জন্য যারা জেল-জুলুম ভোগ করেছে তাদের অবস্থান কোথায়?”
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বসির আহমেদ সবুজ বাকেরগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য রুহুল আমিন হাওলাদার ও তার স্ত্রী রত্মা আমিনের ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সহযোগী। অভিযোগ রয়েছে, গত ১৭ বছরে তিনি রুহুল আমিন হাওলাদারের ক্ষমতার ছত্রছায়ায় দাঁড়িয়াল ইউনিয়ন, বাকেরগঞ্জ উপজেলা এবং বরিশাল আদালত চত্বরে বিএনপি নেতাকর্মীদের হয়রানি ও দমন-পীড়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
এছাড়া স্থানীয়দের অভিযোগ তিনি টিআর, কাবিখা, কাবিটা প্রকল্পের সরকারি বরাদ্দ প্রভাব খাটিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবৈধ অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ বাণিজ্য করতেন। তার বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ ও কমিশন বাণিজ্যেরও অভিযোগ রয়েছে। এলাকায় ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে যে, বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে বিএনপিতে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন বসির আহমেদ সবুজ। যদিও এই অভিযোগের সরাসরি প্রমাণ কেউ উপস্থাপন করতে পারেনি, তবে স্থানীয় নেতাকর্মীদের বড় অংশই এটিকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করছেন।
অনেক সাধারণ ভোটার ও বিএনপির সমর্থক মনে করেন, এমন বিতর্কিত ব্যক্তিকে দলে অন্তর্ভুক্ত করলে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে এবং আসন্ন নির্বাচনে দলের ভোটব্যাংক দুর্বল হতে পারে। ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়লে সাংগঠনিক সংকটও তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিএনপি প্রার্থী আবুল হোসেন খানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। অন্যদিকে দাঁড়িয়াল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইশতিয়াক আহমেদ মাসুদ হাওলাদার ও সাধারণ সম্পাদক মনির হাজ্বী বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সব মিলিয়ে, জাতীয় পার্টির এই নেতার বিএনপিতে যোগদান বাকেরগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং তৃণমূল বিএনপির ভেতরে বিভক্তি আরও প্রকট করে তুলেছে।