বরিশালে জমি বুঝে পেতে ২৫ বছর ধরে লড়াই করছেন ভূমিহীন বৃদ্ধ খালেক
নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারের দেওয়া খাস জমি বন্দোবস্তের প্রায় ৩০ বছর পরে মালিকানা বুঝে পেলেও ভূমিদস্যু চক্রের সদস্যদের বাধা আর হুমকি প্রদানের কারনে জমির ধারে যেতে পারছেনা বরিশাল সদর উপজেলার সায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের হায়াৎসার গ্রামের ভূমিহীন বৃদ্ধ আঃ খালেক তালুদার। শুধু খালেক তালুকদারই নয়, সদর উপজেলার অনেক ভূমিহীন পরিবার ভুমিদস্যুদের ভয়ে জমির কাছে যেতে পারছেনা এবং তাদের ভয়ে মুখ খুলতেও রাজিনা অনেকে।
ভূমিহীনদের অভিযোগ, রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশয়ে এসব জমি ভূমিদস্যুরা ভোগদখল করছে যুগ যুগ ধরে। এমনকি সরকারের দেওয়া ভূমিহীনদের কবুলিয়তনামা দলিলও ভূয়া ভাবে তৈরি করে নিয়েছে চক্রটি। সরকার দেওয়া বন্দোবস্তের জমির দখল পেতে স্থানীয় প্রশাসন সহ বিভিন্ন দপ্তরে কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি ভুক্তভোগীদের। একথা গুলো কান্না জড়িত কন্ঠে বলছিলেন সদর উপজেলার সায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের হায়াৎসার গ্রামের ভূমিহীন মৃতঃ আঃ রব তালুকদারের অসুস্থ বৃদ্ধ ছেলে আঃ খালেক তালুদার।
অনুসন্ধানে জানা যায়- ১৯৭৪-১৯৭৫ সালে প্রথম বরিশাল সদর উপজেলার ৮৩ নং উত্তর হায়াৎসার মৌজার ভূমিহীন পরিবারদের ভূমির জন্য ডিসি অফিসে আবেদনকারীদের দেওয়া শুরু হয় সরকারি বন্দোবস্তকৃত জমি। তার ধারাবাহিকতা হিসেবে ১৯৯২-১৯৯৩ সালে সায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের কামারপাড়া গ্রামের হায়াৎসার মৌজার জেল নম্বর-৮৩, এস এ সৃজিত খতিয়ান নং-৪৩৫ (ক), এস.এ. দাগ নং-২১৫৭, ২১৫৮ দাগের জমির পাশের নাল (কৃষি) এই দুই দাগের দেড় একর জমি ভূমিহীন আঃ রব তালুকদারকে খাস জমির বন্দোবস্ত দেয় সরকার। আঃ রব তালুকদার জীবিত থাকাকালীন বন্দোবস্তকৃত জমি তাদের দখলে থাকলে রবের মৃত্যুর পর উক্ত জমিতে যেতে পারছেনা তার ছেলে ও পরিবারের লোকজন। স্থানীয় প্রভাশালীদের বাধা আর হুমকিতে আজও বন্দোবস্ত খাস জমি বুঝে পায়নি খালেক ও তার পরিবারের লোকজনরা। শুধু তাই নয় বছরের পর বছর ভূমি অফিস, কাউনিয়া থানা, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, সরকারী বিভিন্ন দপ্তর এবং কি বিভিন্ন মহলের কাছে গেলেও কোন সমাধান আজ পর্যন্ত পাননি খালেক।
ভুক্তভোগী খালেক বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ৩২৭ কেটি ১৯৯২-১৯৯৩ সালে খাস জমি বন্দোবস্তের ১৫০ একর জমি পান আমার বাবা রব তালুকদার। তবে বন্দোবস্ত জমি শিকারপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও হায়াতসার এলাকার জামাই বিবাদীগন মজনু ভূইয়া ও মাসুদ হাওলাদার, সোহরাব খাঁ, আজিজ খাঁ, খলিল মোল্লা, মিজান হাওলাদার, ইউনুছ হাং এরাও সরকারী বন্দোবস্ত জমি পান। বিবাদীদের জমির পাশে অন্যদের জমি থাকার সত্বে অন্য ব্যক্তি বন্দোবস্ত কার্ডের জমি ভোগদখলে যেতে চাইলেও বিবাদীরা তাদের বাধা প্রদান সহ প্রানাশের হুমকি প্রদান করে যাচ্ছে বিবাদীরা। তবে এবিষয়ে স্থানীয় ভাবে দফায় দফায় শালিশ মিমাংসা, কাউনিয়া থানায় কয়েকবার শালিশী করা হলেও বিবাদীরা তা মানেনা। পরে খাস জমি বন্দোবস্ত পাওয়া রবের ছেলে আঃ খালেক স্থানীয় পাশের বন্দোবস্ত জমির মালিক মজনু ভূইয়া, মাসুদ হাওলাদার, সোহরাব খাঁ, আজিজ খাঁ, খলিল মোল্লা, মিজান হাওলাদার, ইউনুছ হাওলাদারকে বিবাদী করে সায়েস্তাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের অভিযোগ দিলে পরিষদের সাবেক চেয়াম্যান আরিফুজ্জান মুন্না ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফরাদ হোসেন স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ গর্নমান্যব্যক্তিদের নিয়ে উভয় পক্ষের কাগজপত্র যাছাই বাছাই করে দেখেন ভুক্তভোগী মৃত রবের জমি রয়েছে। পরে শালিশগণরা বিবাদীদের রবের ছেলে খালেককে তার কার্ডের বন্দোবস্ত জমি ছেড়ে দিতে বললেও বিবাদীরা তা মানছেনা। তবে এদের মধ্যে মজনু ভূইয়ার বাড়ি বাবুগঞ্জের শিকারপুরে। এবং তিনি সায়েস্তাবাদের হায়াতসার গ্রামের জামাই হওয়ার সত্ত্বে গরীব অসহায় মানুষের জমি জোর পূর্বক তার বাহিনীধারা দখল করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বন্দোবস্ত জমি পেতে এখানেই শেষ হয়নি ভুক্তভোগী খালেকের লড়াই। তিনি বাধ্য হয়ে ২০২৩ সালে মোকাম বরিশাল বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রিট আদালতে ১৪৪/১৪৫ ধারায় ফৌজদারী মামলা করেন। মামলা নং-১২১/২০২৩ (কাউনিয়া) ১৮৮ ধারা। ২০২৪ সালেও মোকাম বরিশালের বিজ্ঞ এ্যাক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রিট আদালতে ফৌজদারী কার্যবিধির ১০৭/ ১১৭ (গ) ধারা মোতাবেক একটি মামলা দায়ের করেন খালেক তালুকদার। পরে আদালত উক্ত এমপি মামলা ১২১/২০২৩ মামলাটির কাউনিয়া থানার তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য কাউনিয়া থানার অফিসার ইনর্চাজকে দায়িত্ব দেন। থানা পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারেন ১৮৮ ধারা অনুযারী বিবাদী মজনু ভূঁইয়া বিজ্ঞ আদালতের আদেশ অমান্য করিয়া বিরোধী ভুমিতে কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। যারা আইন অনুয়ায়ী ১৮৮ ধারা যাহা আপরাধীয়। প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় হলেও বন্দোবস্তের জমির মালিকানা বুঝে নিতে পারছেনা ভূমিদস্যু চক্রের সদস্যদের বাধা আর হুমকি প্রদানের কারনে।
বন্দোবস্ত জমির মালিক খালেক আরো বলেন, ভূমিদস্যূ বাহিনীকতৃক হামলা-মামলা, হয়রানী হওয়ার পরে আমি আমার বন্দোবস্তের জমির বুঝে পাওয়ার জন্য লড়াই করে যাচ্ছি। তবে বয়স হওয়ার কারনে হাটাচলা করতে না পায়ায় আমার আত্মীয় তিনি সার্বিক বিষয়ে দেখছেন। তাকেও ভূমিদস্যূ বাহিনীরা হুমকি-দামকি দিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ ভুমিহীন ভূক্তভোগীর রবের ছেলে খালেক তালুকদার ওই বন্দোবস্তকৃত সরকারি খাস জমি ভূমিদস্যূদের হাত থেকে ফিরে পেতে এবং সরকারী বন্দোবস্ত সম্পত্তি সরকারী সার্ভেয়ার দ্বারা পরিমাপ অন্তে পিলার স্থাপনের জন্য বরিশাল জেলা প্রশাসকের নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ভুমিহীন মৃত আঃ রব তালুকদারের ছেলে খালেক তালুকদার। পরে জেলা প্রশাসক বিষয়টি সরজমিনে তদন্ত করে জমির সিমানা নির্ধারনের জন্য বরিশাল সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে নির্দেশ প্রদান করেন। পরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তা সরজমিনে সার্ভেয়ার দ্বারা মেপে পিলার স্থান করে দিলেও ভূমিহীন খালেকের বন্দোবস্তকৃত জমির থেকে সিমানা নির্ধারনের পিলার রাতের আধারে উঠিয়ে নিয়ে যায় ভূমিদস্যু বাহিনীরা। থানা থেকে শুরু করে প্রশাসনের সব দপ্তরে গিয়েও ভূমিদস্যু হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না ভূমিহীন পরিবারটি। ভূমিদস্যু বাহিনীর খুটির জোর কোথায় এনিয়ে স্থানীয়দের মাঝে নানা প্রশ্ন জেগেছে।
নাম প্রকাচ্ছে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, এই ভূমিদস্যু চক্রটি স্থানীয় কিছু বিএনপির নেতাদের ছত্রছায়ায় নিজের বিএনপির কর্মী পরিচয় দিয়ে অপকর্ম চালিয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। তারা কোন আইনকানুন মানছেনা। শুধু বৃদ্ধ খালেক তালুকদারই নয়,আরো অনেক গরীব অসহায় ভূমিহীনদের বন্দোবস্তকৃত সরকারি খাস দখলে নিতে মরিয়া রয়েছেন চক্রটি। উল্লেখিত ব্যাক্তিদের অব্যাহত হুমকি এবং ষড়যন্ত্রে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ভূমিহীন পরিবারটি। ভূমিদস্যুদের ষড়যন্ত্র থেকে রেহাই পেতে এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে শেষ সম্বল বন্দোবস্তের ভোগদখল যাতে শান্তিপূর্ণ করতে পারে তার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলা প্রশাসকের কাছে দাবি জানিয়েছেন অসহায় পরিবারটি।
এ ব্যাপারে অভিযুক্তদের মধ্যে মজনু ভূঁইয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বিকার করে বলেন আমি ২৫ বছর আগে জমি কিনেছি। আমরার বিরুদ্ধে কিছু দিন পর পর মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করে যাচ্ছে। আমি অসুস্থ কথা বলতে পারবো না। আপনি পরে ফোন দিয়েন। না হলে আমি সুস্থ হয়ে আপনার অফিসে এসে আপনার সাথে যোগাযোগ করবো বলে ফোন কেটে দেন তিনি।
বরিশাল সদর উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার জালাল উদ্দিন আহমেদ সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা হলে তিনি বলেন, সায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের কামাড়পাড়া গ্রামের হায়াতসার এলাকার মৃত আঃ রব তালুকদারের ছেলে মোঃ খালেক তালুকদার তাদের বন্দোবস্তকৃত জমির দখল পাওয়ার জন্য আবেদন করলে, আমরা দুই জন সরকারী সার্ভেয়ার ঘটনাস্থলে আইন অনুযায়ী তার কার্ডে থাকা দাগের জমি মেপে সিমানা নির্ধারনের জন্য পিলার স্থান করে দিয়ে আসি। কিন্তু তার পরে দিন সকালে ভুক্তভোগী খালেক পরিবারের লোকজন ফোন করে জানান সিমানা নির্ধারনের যে পিলার আপনার দিয়ে গেছেন তা বিবাদীপক্ষরা উঠিয়ে নিয়ে গেছে। এবং কি ওই জমিতে আমাদের প্রবেশ করতে বাধা প্রদান করে যাচ্ছে। বিষয়টি জানান পরে আমি সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্যারকে জানালে তিনি বলেন ভুক্তভোগী পরিবারকে বলেন তাদের আদালতে গিয়ে মামলা করার জন্য।
উল্লেখ্য- উভয় পক্ষের কাগজপত্র যাচাই এবং শুনানী গ্রহণ করা হয়। শুনানীকালে প্রতিপক্ষগণ বন্দোবস্তকৃত ব্যক্তির সম্পত্তি ছেড়ে দিবে বলে অঙ্গীকার করলেও সেটা বিবাদীরা না মেনে আইন ভঙ্গ করেছেন। তাই বিবাদীদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধ্য/ বিঘ্ন সৃষ্টি করায় কারনে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
এ ব্যাপারে বরিশাল সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আজহারুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমরা অবগত রয়েছি। তিনি বন্দোবস্তকৃত জমির দখল পাওয়ার জন্য আবেদন করেন। পরে আমাদের সরকারী সার্ভেয়ার ধারা সরজমিনে গিয়ে মেপে পিলার স্থাপন করে দিয়ে আসলে বিবাদীরা নাকি সেই পিলার জমি উঠিয়ে নিয়ে যায়। তিনি আরো ভুক্তভোগী বিষয়টি নিয়ে আদালতে একটি মামলা চলমান রয়েছে। ইতিপূর্বে আদালত থেকে তদন্তের জন্য আমাদের কাছে পাঠিয়েছে। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদক প্ররন করা হবে। তবে বিবাদীরা সরকারী আইন অমান্য করার বিষয়টিও আদালতে জানানো হবে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে তথ্য প্রমানিত হলে আদালতই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিবে।
উল্লেখ্য- তবে সচেতন মহলের দাবি সরকারী খাস জমির বন্দোবস্ত এক জন ভূমিহীন কৃষকরাই যেন পায় এমনতাই প্রত্যাশা সকলের।
