নানামুখি সংকট আর সীমাবদ্ধতার পাশপাশি জনসচেতনতার অভাব সহ উদাসীনতায় বরিশালে সংক্রামক রোগের বিস্তার জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমশ মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করলেও বিষয়টি নিয়ে দায়িত্বশীল পর্যায়ে তেমন কোন উদ্যোগ নেই। ফলে ডায়রিয়া, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়া সহ ঠান্ডাজনিত নানা ধরনের রোগব্যাধীর বিস্তার অনেকটাই খারাপ পরিস্থিতি তৈরী করলেও তা থেকে উত্তরণের তেমন কোন উদ্যোগ নেই। সদ্য সমাপ্ত বছরে বরিশাল বিভাগের শুধু সরকারি হাসপাতালগুলোতেই প্রায় ৮৮ হাজার ডায়রিয়া রোগী ছাড়াও ভর্তিকৃত প্রায় ২২ হাজার ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ৫১ জনের মৃত্যু হয় বলে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর জানিয়েছে। এসময়ে নিউমোনিয়া সহ ঠান্ডাজনিত নানা রোগব্যাধীতে আক্রান্ত প্রায় ৪০ হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুর মধ্যে শুধু সরকারি হাসপাতালেই ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজার। মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১০ জনের। এরমধ্যে গত নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসেই সরকারি হাসপাতালে সাড়ে ৮ হাজার নিউমোনিয়া সহ ঠান্ডাজনিত রোগী ভর্তি হয় বলে জানাগেছে। সরকারি হাসপাতালে এখনো এধরনের রোগীর উপস্থিতি অব্যাহত রয়েছে।
কিন্তু চিকিৎসকের অভাবে বরিশাল অঞ্চলের প্রায় সব সরকারি হাসপাতালেই মানসম্মত চিকিৎসা প্রদান কষ্টকর হয়ে পড়ছে। বর্তমানে বরিশাল বিভাগের জেলা সদর সহ ৪২টি উপজেলায় ১২ শতাধিক চিকিৎসক পদের বিপরিতে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৭০ জনের মত। যা অনুমোদিত জনবলের এক-তৃতীয়াংশেরও কম।
বরিশাল অঞ্চলের প্রায় সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ৩১শয্যা থেকে ৫০শয্যায় উন্নীত করা হলেও চিকিৎসক ও নার্স সহ স্বাস্থ্যকর্মীর মঞ্জুরী এখনো আগের অবস্থানেই আছে। উপরন্তু কয়েকটি জেলা সদরের হাসপাতালগুলোকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও চিকিৎসক সহ অন্যসব জনবল পূর্বের অবস্থানেই রয়ে গেছে। কিন্তু পূর্বের জনবলেরও দুই-তৃতীয়াংশ চিকিৎসক নেই। খোদ বরিশাল বিভাগীয় সদরের জেনারেল হাসপাতালটি কাগজেপত্রে ১শ শয্যায় উন্নীত করা হলেও সেখানে চিকিৎসক ও নার্স সহ জনবল মঞ্জুরী এখনো ৫০ শয্যার। এক-তৃতীয়াংশ পদে চিকিৎসক নেই।
পুরনো জনবল দিয়ে হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে বাড়তি রোগী ভর্তি করা হলেও চিকিৎসকদের পদতো বাড়েইনি, উল্টো আগের জনবলের দুই-তৃতীয়াংশ পদ শূন্য থাকায় পুরো বরিশাল অঞ্চলের চিকিৎসা ব্যবস্থা এখন ভয়াবহ বিপর্যয়ের কবলে।
এরসাথে প্রতিবছরই ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া সহ ঠান্ডাজনিত রোগীর চাপে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। একদিকে চিকিৎসক সংকট, অপরদিকে জনসচেতনতার অভাব সহ স্বাস্থ্য বিধি প্রয়োগে প্রশাসনিক উদাসীনতায় এসব রোগব্যাধী চরম সংকট তৈরী করছে। গত বছরজুড়েই বরিশাল অঞ্চলে ডেঙ্গু রোগীর ভীড়ে হাসপাতালগুলোতে জরুরী পরিস্থিতির তৈরী করে। এর সাথে সেখানে হাজার হাজার ডায়রিয়া রোগী পরিস্থিতি আরো নাজুক করে তোলে। শীত মৌসুম শুরুর সাথেই নিউমোনিয়া সহ ঠান্ডাজনিত রোগীর ভীড় শুরু হয়েছে সরকারি হাসপাতালগুলাতে। ফলে এ অঞ্চলের কোন হাসপাতালের মেঝেতেও এখন রোগীর ঠাঁই হচ্ছে না।
বছরজুড়ে এডিস মশা পুরো বরিশালে দাপিয়ে বেড়ালেও এ অঞ্চলে মশক নিধনে কোন নিবিড় কর্মসূচী গ্রহণ করেনি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো । এমনকি গত বছরজুড়ে বরিশালের গ্রাম-গঞ্জে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও ছিলো অনেক। শুধু সরকারি হাসপাতালেই ২২ হাজার ভর্তিকৃত রোগীর ৫১ জনের মৃত্যু হয়। তবে প্রকৃত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরো কয়েকগুন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
গতবছর বরিশালে সাম্প্রতিককালের সর্বোচ্চ প্রায় ৮৮ হাজার ডায়রিয়া রোগী সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হলেও এ অঞ্চলে এখনো ডায়রিয়া প্রতিরোধে তেমন কোন কর্মকান্ড দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। মূলত পথ খাবারের দোকান আর বিশুদ্ধ পানির সংকট পুরো বরিশাল অঞ্চলে ডায়রিয়া সহ পেটের পীড়ার বিস্তৃতিকে আরো তড়ান্বিত করলেও তা থেকে উত্তরণের কোন উদ্যোগ নেই। পথ খাবারের দোকান বরিশাল মহানগরী সহ এ অঞ্চলের সংস্কৃতিতে একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠলেও সেখানে কোন স্বাস্থ্যবিধি মানছে না কেউ। এমনকি স্বাস্থ্যবিধি প্রয়োগে সিটি করপোরেশন সহ পৌরসভাগুলো এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরও তেমন কোন উদ্যোগ নেই।
অপরদিকে, গতবছরের শুরু থেকে মার্চের শেষভাগ পর্যন্ত পুরো বরিশাল অঞ্চলজুড়ে নিউমোনিয়া সহ ঠান্ডাজনিত রোগের সাথে ডায়রিয়ার বিস্তৃতি ছিল ব্যাপক। আবার শীত মৌসুম শুরুর সাথে নভেম্বর থেকেই এসব রোগ পুনরায় জেকে বসে। শুধু নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসেই প্রায় ১০ হাজার নিউমোনিয়া সহ ঠান্ডাজনিত রোগী ভর্তি হয়েছেন সরকারি হাসপাতালে। এসব বিষয়ে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শ্যমল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন-চিকিৎসকদের পদ শূন্য থাকার মধ্যেও আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি হাসপাতাল থেকে যেন কেউ বিনা চিকিৎসায় ফিরে না যায়। ডায়রিয়া, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়া সহ ঠান্ডাজনিত রোগের বিষয়ে জনসচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন-জনসচেতনতা এসব সংক্রমক ও অসংক্রমক রোগ থেকে ব্যক্তি পর্যায়ের পাশাপাশি সমাজকেও রক্ষা করতে সক্ষম।