মির্জা রিমন ॥ আসন সমঝোতা ভেঙে ১১ দলীয় জোট থেকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সরে দাঁড়ানো দক্ষিণাঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও পুনর্মূল্যায়নের সূচনা করেছে। বিশেষ করে বরিশাল অঞ্চলকে ঘিরে ইসলামপন্থি রাজনীতির যে ঐক্যবদ্ধ কাঠামো গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এসে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পাঁচ আগস্টের পর থেকে ইসলামপন্থি দলগুলোকে একটি অভিন্ন নির্বাচনী কাঠামোর আওতায় আনার যে উদ্যোগ চলছিল, ইসলামী আন্দোলনের একক নির্বাচনের ঘোষণায় সেই প্রয়াস কার্যত প্রশ্নের মুখে পড়েছে। একটি ‘এক বাক্স নীতি’ বা সমন্বিত কৌশলের মাধ্যমে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে আসনভিত্তিক বোঝাপড়া হবে এমন ধারণা নিয়েই মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমঝোতার অভাবে সেই প্রচেষ্টা ভেঙে পড়েছে। যা সামনে ইসলামপন্থি রাজনীতির পথচলাকে আরও জটিল করে তুলছে।
গত শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জানায়, তারা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। দলটির পক্ষ থেকে ২৬৮টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়। তবে এই ঘোষণার পরও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সঙ্গী জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না আসায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে।
বরিশাল-৫ (সদর) আসনে এই ঘোষণার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে সেখানে মনোনীত হয়েছেন দলটির নায়েবে আমির ও চরমোনাই পীর পরিবারের সদস্য মুফতি ফয়জুল করিম। স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, এই আসন ঘিরে ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা চলছিল। জোটের ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে পূর্ববর্তী সময়ে একাধিক সম্ভাবনাময় আসনে ছাড় দেওয়ায় জামায়াতের তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ জমে উঠেছিল। এতে ইসলামপন্থি ভোট বিভাজনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি এই আসনেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতে ইসলামীর একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, বরিশাল সদর আসনে তাদের প্রার্থী সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকলেও বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার স্বার্থে দলকে পিছিয়ে আসতে হয়েছে। তাদের মতে, এই ছাড়ের ফলে মাঠপর্যায়ে যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বরিশাল সদর আসনের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনী বিষয়ে দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বিবেচিত হবে। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত অবস্থানের চেয়ে দলীয় সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং দল যেখানে প্রয়োজন মনে করবে, তিনি সেখানেই দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত। নির্বাচনী প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকবেন বলেও জানান।
বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় থাকলেও ইসলামী আন্দোলনের একক প্রার্থী থাকায় ইসলামপন্থি ভোট বিভাজনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী মাঠে সক্রিয় থাকলেও দলীয়ভাবে সংগঠনকে পুনর্গঠনের চেষ্টা চলমান। ফলে সাংগঠনিক দিক থেকে বিএনপি তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে থাকলেও ইসলামপন্থি ভোট বিভক্ত হলে সেই সুযোগ শেষ পর্যন্ত বিএনপির দিকেই ঝুঁকে যেতে পারে।
বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনে অতীতেও ত্রিমুখী প্রতিযোগিতা দেখা গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জোট ভাঙনের ফলে এখানে ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াত আলাদা প্রার্থী দিলে বিএনপি তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে যেতে পারে। একই সমীকরন বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে। এই আসনে ব্যক্তি প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা বরাবরই বড় ভূমিকা রাখে। ইসলামপন্থি ভোট বিভাজিত হলে বিএনপি কিছুটা এগিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হলেও, স্থানীয় নেতৃত্ব সংকট থাকায় ফলাফল অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে। বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ) আসনকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠনের সক্ষমতা যাচাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। নদীভাঙন, যোগাযোগব্যবস্থা ও উন্নয়নবঞ্চনার মতো ইস্যুগুলো এখানে ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে। এ আসনে ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতে ইসলামীর পৃথক অবস্থান ভোটারদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি করতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জোট ভাঙনের ফলে এখানে বিএনপি দল সরাসরি লাভবান হবে।
বরিশাল-৬ আসনে ইসলামী আন্দোলনের সাংগঠনিক উপস্থিতি তুলনামূলক নতুন হলেও জামায়াতের একটি স্থায়ী ভোটব্যাংক রয়েছে। বিভাজনের সুযোগ নিয়ে বিএনপি এখানে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে, তবে তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির ওপর। তবে বিএনপির জন্য পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুকূলে এমনটি মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দলটির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও জনআস্থা নিয়ে প্রশ্ন এখনো কাটেনি।
এদিকে বরিশাল মহানগরী সহ পুরো ৬টি আসনেই বিএনপির নেতৃত্ব সংকট ও সংগঠন দুর্বলতা ভোটারদের মধ্যে সংশয় তৈরি করছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এখনো মাঠপর্যায়ে সুসংগঠিত প্রস্তুতির স্পষ্ট চিত্র দেখা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী আন্দোলনের একক নির্বাচনের ঘোষণা দক্ষিণাঞ্চলের ভোটের অঙ্ককে জটিল করে তুলেছে। ইসলামপন্থি রাজনীতির বিভাজন, বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং ভোটারদের মনোভাব এই তিনটি বিষয়ই শেষ পর্যন্ত বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। ফলে বরিশালের রাজনীতি এখন দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন, অনিশ্চিত ও বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতার মোড়ে।