বরিশালে পুলিশের বিরুদ্ধে অবৈধ ৪ অটো জব্দ করে ২ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ

এ.এ.এম হৃদয় | ২০:২৩, জানুয়ারি ১৫ ২০২৬ মিনিট

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশালে ওয়ার্কশপে নির্মিত চারটি অবৈধ ব্যাটারিচালিত হলুদ অটোরিকশা জব্দ করে সেগুলো ছাড়াতে প্রতি গাড়ির জন্য ৫০ হাজার ৪টি গাড়ির জন্য মোট দুই লাখ টাকা ঘুষ দাবি করার অভিযোগ উঠেছে বরিশাল বন্দর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোঃ জাহিদের বিরুদ্ধে। ঘুষের টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় দীর্ঘ এক মাস ধরে জব্দকৃত চারটি অটোরিকশা থানায় আটকে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দুই ভুক্তভোগী ওয়ার্কশপ মালিক ইমরান ও রাসেল। ভুক্তভোগীদের দাবি, এ ঘটনায় ইতোমধ্যে এসআই জাহিদকে ১৫ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়া হয়েছে এর মধ্যে ইমরান দিয়েছেন ১০ হাজার টাকা এবং রাসেল দিয়েছেন ৫ হাজার টাকা। বিষয়টি উভয় ভুক্তভোগী নিশ্চিত করেছেন। ওয়ার্কশপ মালিক ইমরান ও রাসেল প্রশ্ন তুলেছেন, “যদি গাড়িগুলো অবৈধ হয়ে থাকে, তাহলে থানায় মামলা বা জিডি করে আদালতে পাঠানো হলো না কেন?” তারা বলেন, “মামলা হলে আমরা আইনিভাবে মোকাবিলা করতাম। কিন্তু আজ দেব, কাল দেব এই আশ্বাসে এক মাস পার হয়ে গেছে। তবুও গাড়ি ছাড়ছে না, কোর্টেও পাঠানো হয়নি।” সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল সদর উপজেলার ৭নং চরকাউয়া ইউনিয়নের বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে ৯নং ওয়ার্ডস্থ পশ্চিম কর্ণকাঠী গ্রামের খালের পাশে সাবেক বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান খসরুর গরুর ফার্মের ভেতরে অবস্থিত ওয়ার্কশপে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর সকালে বিপ্লব ও রুম্মান নামে দুই যুবক নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে প্রবেশ করেন। তারা ওয়ার্কশপে অবৈধ অটোরিকশা নির্মাণের বিষয়ে জানতে চান এবং একপর্যায়ে ওয়ার্কশপ মালিক ইমরানের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। ইমরান চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কথিত সাংবাদিক বিপ্লব ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশে অবৈধ অটোগাড়ি তৈরির অভিযোগ জানান। ৯৯৯-এর ফোন পেয়ে বরিশাল বন্দর থানার এসআই মোঃ জাহিদ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুটি নির্মিত অটোরিকশা জব্দ করেন এবং এক মিস্ত্রিকে আটক করে থানায় নেওয়ার চেষ্টা করেন। বিষয়টি জানতে পেরে ওয়ার্কশপ মালিক ইমরান বন্দর থানার আরেক এসআই রাসেলকে ফোন করেন। তখন এসআই রাসেলের অনুরোধে মিস্ত্রিকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং দুটি অটো থানায় নেওয়া হয়। এ সময় এসআই রাসেলের মাধ্যমে এসআই জাহিদকে বিকাশের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ইমরান। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এসআই রাসেল তার কাছ থেকে প্রতিমাসে ৩ হাজার টাকা মাসোহারা নিতেন। এ সংক্রান্ত স্বীকারোক্তিমূলক অডিও ও ভিডিও প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। ইমরানের ওয়ার্কশপ থেকে ১৪ ডিসেম্বর দুটি অটো জব্দ করার পরের দিন, অর্থাৎ ১৫ ডিসেম্বর, পাশের ব্যবসায়ী রাসেলের ওয়ার্কশপ থেকে আরও দুটি নির্মিত অটো জব্দ করে নিয়ে যান এসআই মোঃ জাহিদ। ওয়ার্কশপ মালিক রাসেল বলেন, “১৪ ডিসেম্বর জাহিদ স্যার ভয়ভীতি দেখিয়ে আমার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা নেন। কিন্তু পরদিন সকালে এসে বলেন‘ একটু সমস্যা হয়েছে, তোর গাড়ি দুটো থানায় নিতে হবে। চিন্তা করিস না, দুই দিন পর নিয়ে আসবি।’” কিন্তু ৩০ দিন অতিবাহিত হলেও তার গাড়ি ছাড়ানো হয়নি। উল্টো মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। রাসেল আরও অভিযোগ করেন, বন্দর থানার আরেক এসআই পিন্টু পাল গাড়ি ছাড়াতে দুই লাখ টাকা লাগবে বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি আগে পিন্টু স্যারকে মাসে ৭ হাজার টাকা দিতাম। জাহিদ স্যারকে ১৫ ডিসেম্বর ৫ হাজার টাকা দেওয়ার পরও গাড়ি থানায় নেওয়া হয়েছে।” গাড়ি ছাড়ানোর বিষয়ে একাধিকবার ফোন দিলে এসআই জাহিদ ও পিন্টু পাল বিভিন্ন অজুহাত দেখান কখনো ওসি নতুন এসেছেন, কখনো ছুটিতে আছেন, কখনো সাক্ষ্য দিতে গেছেন এভাবেই সময় পার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ওয়ার্কশপ মালিক বলেন, এসআই জাহিদ ও এসআই পিন্টু পাল বন্দর থানার এলাকার সকল ওয়ার্কশপ মালিকদের কাছ থেকে মাসোহারা নিয়ে থাকেন। নতুন করে অটোগাড়ি বানানো নিষিদ্ধ থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা চাঁদাবাজিতে মেতে উঠেছেন বলে বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অভিযোগের বিষয়ে এসআই মোঃ জাহিদ বলেন, “দুই সাংবাদিকের ফোনে গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। গাড়িগুলো থানা হেফাজতে আছে। ওসি স্যার নতুন এসেছেন, এখনও বিস্তারিত বলা হয়নি।” ৩০ দিন পেরিয়ে গেলেও মামলা করে কোর্টে না পাঠানোর বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “ওরা গরিব মানুষ। কোর্টে জানালে গাড়ি ফেরত পাওয়া যাবে না। তাই ওদের উপকারের জন্য জানানো হয়নি।” কাউনিয়া থানায় বদলি হওয়া এসআই রাসেল মাসোহারা ও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। এসআই পিন্টু পালও রাসেলের কাছ থেকে মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আপনি সরাসরি রাসেলের সাথে আমাকে কথা বলান।” বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, “নতুন করে অটো গাড়ি নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেউ যদি ম্যানেজ করে এমন কাজ করে, তারাও আইনের আওতায় আসবে।” ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখছি।” ছুটিতে থাকায় বন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইসমাঈল হোসেনের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।